বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়ে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘লন্ডন ষড়যন্ত্রে’র গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, বিগত সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই বিএনপিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানোর নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এসব চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেন।
‘লন্ডন ষড়যন্ত্র’ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা
ডা. তাহের তার বক্তব্যে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান পর্দার আড়ালে থেকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ছিলেন কথিত ‘লন্ডন ষড়যন্ত্রের’ (London Conspiracy) মূল কারিগর। তিনি বিগত সরকারের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সেই সরকারেরই বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানো।” জামায়াত নেতার এই দাবি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে যখন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (Interim Government) রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও স্বচ্ছতার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে ডা. তাহের অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকারের সময় থেকেই পর্দার আড়ালে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Election Engineering) বা নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, “সাবেক উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার একটি অপচেষ্টা চলেছে। এ বিষয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জাতির কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, একদল উপদেষ্টার কর্মকাণ্ড কি জাতির সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষাকে ভণ্ডুল করে দিচ্ছে?”
গণভোট ও জনআকাঙ্ক্ষার বিচ্যুতি
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটের (Referendum) ফলাফল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও বর্তমান সরকার সেই পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যাওয়া এবং জনগণের মৌলিক স্বার্থের পরিপন্থী অবস্থান গ্রহণ করার বিষয়ে তিনি সরকারকে সতর্ক করেন। তিনি আরও বলেন, “সারা দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা (Law and Order) পরিস্থিতির যে চরম অবনতি ঘটছে, তা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতারই নামান্তর।”
ডেপুটি স্পিকার পদ ও ‘জুলাই সনদ’
সংবিধান অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার পদের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিষ্কার করেন ডা. তাহের। তিনি জানান, সংবিধানের আলোকে সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো আনুষ্ঠানিক ও লিখিত প্রস্তাব আসে, তবেই জামায়াত এই পদের বিষয়ে বিবেচনা করবে। তবে এক্ষেত্রে তিনি একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ডা. তাহেরের মতে, “ডেপুটি স্পিকার পদের আলোচনার আগে সরকারকে ‘জুলাই সনদ’ (July Proclamation) বাস্তবায়নে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের স্পিরিট রক্ষা না করে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।”
উল্লেখ্য, দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সামনের দিনগুলোতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই বক্তব্যের মাধ্যমে আরও ঘনীভূত হলো।