মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের খবর এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম। ইরানের সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি ইসরায়েল অভিমুখে তেহরানের মিসাইল নিক্ষেপ পরিস্থিতিকে এক বহুমাত্রিক যুদ্ধের রূপ দিয়েছে। এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যা কার্যত বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের মহাসড়ক হিসেবে পরিচিত।
জ্বালানি বাণিজ্যের ‘চোক পয়েন্ট’ ও বৈশ্বিক প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি কৌশলগত কারণে এই প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে আকাশচুম্বী হবে। ইতিহাসে সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালির মতো হরমুজ প্রণালি আজ একটি অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সংঘাতের ফলে শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি ও বাজার পরিস্থিতি অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে 'স্ট্যাগফ্লেশন' (উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধি) দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের স্মৃতি আজ আবারও ফিরে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন বাড়িয়ে স্থিতিশীলতা আনতে চাইলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে স্বর্ণ ও ডলারের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে, যা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
চীন, ভারত ও বড় আমদানিকারকদের সংকট বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন ও ভারত এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই সংকট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন বিশেষ করে পোশাক রপ্তানি খাতকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ ও কূটনৈতিক সমাধান হরমুজ প্রণালি শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি। এর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ববাজারের ভবিষ্যৎ। যদি দ্রুত কূটনৈতিক পন্থায় উত্তেজনা প্রশমিত না হয়, তবে এই অর্থনৈতিক কম্পন উন্নত দেশ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত অনুভূত হবে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বকে জ্বালানি নীতি পুনর্বিন্যাস এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত হওয়ার একটি কঠিন বার্তাও দিচ্ছে।