• মতামত
  • অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতা: যৌন নিপীড়ন রুখতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ

অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতা: যৌন নিপীড়ন রুখতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ

বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস উপলক্ষে অপরাধবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উঠে এল সহিংসতার শেকড় ও প্রতিকারের উপায়।

মতামত ১ মিনিট পড়া
অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতা: যৌন নিপীড়ন রুখতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ

বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস উপলক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যৌন সহিংসতার শেকড় নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। অপরাধবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের আলোকে দেখা যাচ্ছে, কেবল কঠোর আইন নয়, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর করাই হতে পারে নিপীড়নমুক্ত সমাজ গড়ার চাবিকাঠি। ইরা মণির মতো অসংখ্য ভুক্তভোগীর জীবনহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নীরবতা নয় বরং প্রতিবাদই এখন সময়ের দাবি।

আজ ৪ মার্চ, বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস। প্রতিদিন খবরের কাগজে যৌন সহিংসতার খবর পড়তে পড়তে সমাজ যেন এক ধরনের জড়তায় আক্রান্ত। অথচ এই দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যৌন সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

ক্ষমতার দাপট ও অপরাধবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যৌন নিপীড়ন কেবল যৌন লালসার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের একটি মাধ্যম। আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অনেক সময় পুরুষকে এমন এক শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানে রাখা হয়, যেখানে নারীর শরীর ও স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করাকে অধিকার বলে গণ্য করা হয়। 'রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি' অনুযায়ী, যখন একজন সম্ভাব্য অপরাধী উপযুক্ত পরিবেশ পায় এবং সেখানে কার্যকর প্রতিরোধের অভাব থাকে, তখনই অপরাধ সংঘটিত হয়। কর্মক্ষেত্র বা গণপরিবহনে নজরদারির অভাব অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।

ডিহিউম্যানাইজেশন ও সামাজিক শিক্ষার প্রভাব মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে একজন মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল একটি 'বস্তু' হিসেবে গণ্য করে। একে বলা হয় 'ডিহিউম্যানাইজেশন'। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে যে নারীবিদ্বেষী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত 'সোশ্যাল লার্নিং' বা চারপাশের পরিবেশ থেকে শেখা আচরণের ফল। অনলাইনের অশ্লীল মন্তব্য বা অবমাননাকর সংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট ও আমাদের নীরবতা যৌন নিপীড়ন টিকে থাকার অন্যতম কারণ হলো 'বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট'। অন্যায় দেখেও অনেকে এই ভেবে নীরব থাকেন যে অন্য কেউ হয়তো প্রতিবাদ করবে। এই সামষ্টিক নীরবতা অপরাধীকে আরও সাহসী করে তোলে। সমাজ যদি অন্যায়ের মুখে প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে নিপীড়নের এই অন্ধকার দূর করা সম্ভব নয়।

প্রতিকারের পথ: শিক্ষা ও আইনের শাসন পরিস্থিতি উত্তরণে কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। অপরাধ কমাতে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে 'শাস্তির নিশ্চয়তা' বেশি কার্যকর। এছাড়া পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং 'সম্মতি' (Consent)-এর গুরুত্ব শেখাতে হবে। যৌন নিপীড়নকে কেবল নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে, একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের আবশ্যকতা হিসেবে দেখতে হবে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই পারে এই সহিংসতার সংস্কৃতিকে বদলে দিতে।

Tags: bangladesh news social justice women safety sexual-abuse-prevention world-sexual-abuse-awareness-day crime-psychology