• মতামত
  • মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি: কতটা ঝুঁকিতে আমাদের ভবিষ্যৎ?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি: কতটা ঝুঁকিতে আমাদের ভবিষ্যৎ?

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সংকট, রেমিট্যান্স হ্রাস এবং রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মতামত ১ মিনিট পড়া
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি: কতটা ঝুঁকিতে আমাদের ভবিষ্যৎ?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয়ের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি এই সংঘাতের ফলে গভীর সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া বা তেলের দাম বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এখন আর কেবল সংঘাতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই যুদ্ধ এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বয়ে আনতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। ইরান যদি এই পথটি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় অংশ কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরব থেকে আমদানি করে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ বিঘ্নিত হবে, যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

রপ্তানি বাণিজ্য ও পোশাক শিল্পে প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালে অস্থিরতা বাড়লে শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পায়। এতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামাতে পারে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ ও শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। সংঘাতের কারণে দেশগুলোতে নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প থমকে গেলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। এছাড়া নিরাপত্তার খাতিরে শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি জ্বালানির দাম বাড়লে তার চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। ইতোমধ্যে ডলার সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব হবে মরার ওপর খাঁড়ার ঘার মতো। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

উত্তরণের পথ ও কৌশলগত পরিকল্পনা এই বৈশ্বিক সংকট থেকে বাঁচতে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তার সাথে বিশ্বমঞ্চে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, যাতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের রোষানলে না পড়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

Tags: bangladesh economy global crisis iran israel conflict middle east war oil-price-hike remittance-risk