• মতামত
  • বাংলাদেশ তুমি কার: গণরায়, সংবিধান এবং ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ তুমি কার: গণরায়, সংবিধান এবং ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ

জুলাই বিপ্লবের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে লেখক রহমান মৃধার বিশেষ বিশ্লেষণ।

মতামত ১ মিনিট পড়া
বাংলাদেশ তুমি কার: গণরায়, সংবিধান এবং ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ কি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, পরিবার বা বিদেশি শক্তির, নাকি সেই জনগণের যারা রক্ত দিয়ে এই রাষ্ট্র গড়েছে? সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান এবং নির্বাচনের পর এই নৈতিক প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। লেখক রহমান মৃধা তার এই বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জুলাই বিপ্লবের ম্যান্ডেট, সংবিধানের সীমাবদ্ধতা এবং পররাষ্ট্রনীতির জটিল সমীকরণগুলো তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, কেবল সরকার বদল নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কাঠামোগত পরিবর্তনই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন কোনো সাধারণ সরকার বদল নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী গণরায়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা যে বার্তা দিয়েছে, তা হলো—রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

গণরায়ের ম্যান্ডেট ও জুলাই সনদ সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রায় পাঁচ কোটির ব্যবধানে জুলাই সনদ জয়ী হয়েছে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি পরিষ্কার রাজনৈতিক সংকেত। জনগণ কেবল ক্ষমতার চেয়ার পরিবর্তন চায়নি, বরং তারা চেয়েছিল দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র এবং দলীয় দখলদারির অবসান। এই ম্যান্ডেটকে ধারণ করা এবং বাস্তবায়ন করাই এখন নতুন নেতৃত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সংবিধান বনাম জনআকাঙ্ক্ষা সংবিধান কোনো অপরিবর্তনীয় পবিত্র মূর্তি নয়; এটি জনগণের ইচ্ছার লিখিত দলিল। যখন সংবিধানকে স্থিতাবস্থা রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যদি বলা হয় জনগণের চাওয়া বাস্তবায়নে সংবিধান বাধা, তবে প্রশ্ন জাগে—এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হলো? লেখকের মতে, সংবিধানের দোহাই দিয়ে অন্যায়ের কাঠামো বাঁচিয়ে রাখা জনগণের ম্যান্ডেটের পরিপন্থী।

প্রতীকী পরিবর্তন বনাম কাঠামোগত সংস্কার বিলাসবহুল গাড়ি বর্জন বা রাস্তার জট কমানোর মতো প্রতিশ্রুতিগুলো ইতিবাচক, তবে রাষ্ট্রের প্রকৃত সংকট আরও গভীরে। দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙা, প্রশাসনিক স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব কমানো এবং চাঁদাবাজির রুট বন্ধ করাই হলো প্রকৃত সংস্কার। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রীর বক্তব্যে যখন চাঁদাবাজিকে ‘বোঝাপড়া’ হিসেবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তখন তা গণরায়ের সাথে বেইমানির শামিল বলে প্রতীয়মান হয়।

প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও নিরপেক্ষতা সেনাবাহিনী বা প্রশাসনের শীর্ষ পদে রদবদল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে, তবে তা যেন কেবল আনুগত্যের ভিত্তিতে না হয়। প্রতিষ্ঠানের শক্তি নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতার ওপর। দল বদলালে যদি আনুগত্যের মানদণ্ড বদলে যায়, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, ব্যক্তিকে নয়।

পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্ব ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা চীন—প্রত্যেকটি বৃহৎ শক্তি তাদের নিজস্ব স্বার্থ দেখবে, এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম। তবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বলয় বা বৈশ্বিক পরীক্ষাগার হতে পারে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়। বাংলাদেশের স্বার্থই হতে হবে পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত মানদণ্ড।

পরিশেষে, জুলাইয়ের যোদ্ধারা যে নৈতিক পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন, তা যেন ক্ষমতার লোভে হারিয়ে না যায়। বাংলাদেশ কোনো দলের নয়, এটি কেবলই জনগণের। এই সত্যটি প্রমাণের দায়িত্ব এখন বর্তমান প্রশাসনের ওপর।

Tags: bangladesh election bangladesh politics july revolution constitutional reform foreign policy rahman mridha