• দেশজুড়ে
  • কুয়াকাটা সৈকতে জেলিফিশের ‘মড়ক’: সমুদ্রের ভারসাম্য কি তবে বিপন্ন?

কুয়াকাটা সৈকতে জেলিফিশের ‘মড়ক’: সমুদ্রের ভারসাম্য কি তবে বিপন্ন?

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
কুয়াকাটা সৈকতে জেলিফিশের ‘মড়ক’: সমুদ্রের ভারসাম্য কি তবে বিপন্ন?

সৈকতজুড়ে মৃত প্রাণীর দুর্গন্ধ, বিপাকে পর্যটক ও জেলেরা; গবেষকদের মতে জেলিফিশের এই অতি-বৃদ্ধি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য এক অশনিসংকেত।

দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গত দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে দেখা দিচ্ছে এক অভূতপূর্ব ও উদ্বেগের দৃশ্য। ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকতের বিশাল অংশজুড়ে প্রতিদিন জোয়ারের ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসছে হাজার হাজার জেলিফিশ (Jellyfish)। স্বচ্ছ, ছাতার মতো আকৃতির এই প্রাণিগুলো বালুচরে আটকা পড়ে নিস্তেজ হয়ে মারা যাচ্ছে। এই গণ-মৃত্যুর ফলে একদিকে যেমন সৈকতে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পর্যটন পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান বা ‘ইকোসিস্টেম’ (Ecosystem) নিয়ে দেখা দিচ্ছে বড় ধরনের সংশয়।

‘সাদা মেঘের’ মতো সৈকত জুড়ে মৃত্যু

সরেজমিনে দেখা যায়, কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব ও পশ্চিমে মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে এই জেলিফিশের দেহাবশেষ পড়ে আছে। স্থানীয়দের কাছে এগুলো ‘সাদা জেলিফিশ’ বা ‘নোনা’ নামে পরিচিত হলেও এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘ফাইলোরিজা পাংটাটা’ (Phyllorhiza punctata)। সাগরের নীল জলে স্বচ্ছ এই প্রাণিগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বালুচরে এদের পচনশীল দেহ এখন পর্যটকদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পর্যটক শখের বশে এগুলো স্পর্শ করতে গিয়ে ত্বকের জ্বালাপোড়া ও এলার্জির মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

জেলেদের রুটিরুজিতে হানা: ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দামী জাল

জেলিফিশের এই আকস্মিক আধিক্য উপকূলীয় জেলেদের জীবন-জীবিকাকে চরম সংকটে ফেলেছে। গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে জেলেরা দেখছেন যে, জালে মাছের চেয়ে জেলিফিশই বেশি ধরা পড়ছে। জেলেরা জানান, জেলিফিশগুলো জালের সুক্ষ্ম ছিদ্রগুলোতে এমনভাবে প্যাঁচিয়ে যায় যে, তা পরিষ্কার করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে জেলিফিশের ভারে বহুমূল্যের জাল ছিঁড়ে যাচ্ছে। এছাড়া যে অঞ্চলে জেলিফিশের আধিক্য থাকে, সেখান থেকে সাধারণ মাছগুলো সরে যায়, ফলে শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের।

ইকোলজিক্যাল ইমব্যালেন্স: কেন এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি?

কেন কুয়াকাটা উপকূলে এত জেলিফিশের ভিড়? গবেষকরা এর পেছনে গভীর পরিবেশগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল বা ‘ফুড চেইন’ (Food Chain)-এ জেলিফিশ হলো বড় মাছের প্রিয় খাদ্য। বিশেষ করে সামুদ্রিক কাছিম (Sea Turtle), টুনা (Tuna) এবং ম্যাকারেল (Mackerel) মাছ প্রচুর পরিমাণে জেলিফিশ খেয়ে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজিব সরকার মনে করেন, সমুদ্রে ‘ইকোলজিক্যাল ইমব্যালেন্স’ (Ecological Imbalance) বা বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেই এমনটি ঘটছে। তাঁর মতে, “অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং অবৈধ ‘ট্রলিং’ (Trolling)-এর ফলে সাগরে জেলিফিশের প্রাকৃতিক শিকারি মাছ ও কাছিমের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। শিকারি না থাকায় জেলিফিশের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।”

মৎস্য সম্পদের জন্য এক বড় হুমকি

জেলিফিশের এই আধিক্য কেবল বর্তমানের সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য সম্পদকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। জেলিফিশ মূলত মাছের ডিম ও পোনা (Fish Larvae) খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে জেলিফিশের সংখ্যা যত বাড়বে, সাগরে অন্যান্য মাছের বংশবৃদ্ধি তত বাধাগ্রস্ত হবে। এটি একটি ‘ভিসিয়াস সাইকেল’ বা দুষ্টচক্রের মতো—মাছ কমলে জেলিফিশ বাড়ে, আর জেলিফিশ বাড়লে মাছের উৎপাদন আরও কমে যায়।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মৎস্য ব্যবস্থাপনা

সমুদ্রের জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণের ফলেও জেলিফিশের বংশবিস্তার ত্বরান্বিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই বছর আগেও এই অঞ্চলে একই ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রের ‘মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া’ (Marine Protected Area) বাড়ানো এবং শিকারি মাছগুলোর আবাসস্থল রক্ষা করা না গেলে জেলিফিশের এই উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসা এই হাজার হাজার মৃত জেলিফিশ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি নীল অর্থনীতির (Blue Economy) জন্য একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত গবেষণা এবং টেকসই সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার এখনই সময়, নতুবা পর্যটন আর মৎস্য সম্পদ—উভয়ই সংকটের মুখে পড়বে।

Tags: biodiversity bay of bengal environment news jellyfish kuakata beach marine biology ecological imbalance fishery crisis sea turtle pollution.