মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন চরম অস্থিরতা আর যুদ্ধের দামামা। একদিকে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম ওই অঞ্চলে সবথেকে বড় ‘Military Build-up’ বা সামরিক শক্তি জড়ো করেছে মার্কিন বাহিনী, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আসছে একের পর এক হামলার হুমকি। ঠিক এমন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় বসছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই বৈঠককে বিশ্লেষকরা দেখছেন সংঘাত রোধের ‘শেষ প্রচেষ্টা’ হিসেবে, যেখানে একদিকে রয়েছে কূটনীতির টেবিলে ফেরার ডাক, আর অন্যদিকে রয়েছে ‘Maximum Pressure Campaign’ বা সর্বোচ্চ চাপের কৌশল।
ট্রাম্পের ‘ডুয়েল পলিসি’: কূটনীতি বনাম সামরিক অভিযান
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই অনিশ্চয়তার রাজনীতিতে পারদর্শী। একদিকে তিনি বলছেন যে কূটনীতির মাধ্যমেই সংকটের সমাধান করতে চান, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ‘Tactical Strike’ বা সীমিত পরিসরে হামলার সম্ভাবনাও জিইয়ে রেখেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তেহরানকে একটি কঠোর চুক্তিতে বাধ্য করতে হলে এই ধরণের সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ অপরিহার্য।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আট মাস আগে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের সময় যখন মার্কিন বাহিনী ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল, তখন পরিস্থিতি যতটা না বদলেছিল, বর্তমানের এই সামরিক তৎপরতা তার চেয়েও বেশি উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। ট্রাম্প ঠিক কী ধরণের শর্ত পূরণ করলে হামলার পথ থেকে সরে আসবেন, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা থাকলেও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের এই আলোচনায় উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
নিষেধাজ্ঞার নতুন খড়্গ ও ওয়াশিংটনের কৌশল
জেনেভা বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার জাল বিছিয়েছে ওয়াশিংটন। এবার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের ১২টি বিশালাকার তেলবাহী জাহাজ (Oil Tankers) এবং বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, এই কোম্পানিগুলো তেহরানের ‘Ballistic Missile’ বা ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিতে বিপুল অর্থায়ন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন থেকে পুরোপুরি বিরত রাখা। এই ‘Maximum Pressure’ কৌশলের মাধ্যমেই ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করতে চায় হোয়াইট হাউস।
তেহরানের হুঁশিয়ারি ও ‘সম্মানজনক কূটনীতি’
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান এবং নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইরানও দমে থাকতে নারাজ। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য বা ষড়যন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে হামলা চালানো হলে ইরান তার ‘কঠোরতম জবাব’ দেবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তেহরান সম্মানজনক কূটনীতির পথে হাঁটতে আগ্রহী, কিন্তু আলোচনার টেবিলে বসে পিঠে ছুরি মারার চেষ্টা করা হলে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী এক মুহূর্তও সময় নেবে না পাল্টা আঘাত করতে।
তবে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সুরে কিছুটা নরম ভাব লক্ষ্য করা গেছে। তিনি জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির নির্দেশনায় তারা বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ চান এবং জেনেভা বৈঠক থেকে একটি ইতিবাচক ও অনুকূল ফলাফলের প্রত্যাশা করছেন। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) পুরোপুরি বন্ধ করার মার্কিন দাবি প্রত্যাখান করলেও, পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জেনেভা বৈঠকের কুশীলব ও মধ্যস্থতা
ওমানের মধ্যস্থতায় এর আগে হওয়া দুই দফা আলোচনার ধারাবাহিকতায় এবারের পরোক্ষ বৈঠকেও ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী জামাতা জ্যারেড কুশনার। সরাসরি মুখোমুখি না বসলেও ওমানি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব বিনিময় হবে।
আইএইএ-র উদ্বেগ: ফুরিয়ে আসছে সময়?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-র প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ইরানের কাছে এই মুহূর্তে কার্যকর পরমাণু অস্ত্র না থাকলেও, মজুত থাকা ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য উপাদানগুলো যেকোনো সময় অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এই অনিশ্চয়তা যেকোনো মুহূর্তে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো, জেনেভার এই আলোচনা কি সত্যিই শান্তির পথ দেখাবে, নাকি এটি কেবল যুদ্ধের আগের এক পাক্ষিক নীরবতা? বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে জেনেভার দিকে, যেখানে নির্ধারিত হতে পারে আগামীর বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মানচিত্র।