কক্সবাজারে একটি এলপিজি (LPG) গ্যাস পাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তাণ্ডব থেমেছে ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছে এক বুক হাহাকার আর ধ্বংসের গভীর ক্ষত। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৪ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার দুটি বিশালাকার গ্যাস ট্যাংক বিস্ফোরিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেও, পাম্প সংলগ্ন এলাকাটি এখন এক বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখা নিয়ন্ত্রণে এলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মন থেকে এখনো কাটেনি বড় ধরনের দুর্ঘটনার আতঙ্ক। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঁকি দিচ্ছিল সর্বস্ব হারানো মানুষের আর্তনাদ।
আগুনের লেলিহান শিখায় নিঃস্ব পর্যটন সংশ্লিষ্টরা
কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রাণভোমরা হলো পর্যটকবাহী জিপ বা ‘চাঁদের গাড়ি’। এলপিজি গ্যাস স্টেশনের পাশের গ্যারেজটিতে এমন প্রায় ৪০টিরও বেশি গাড়ি রাখা ছিল। আগুনের আকস্মিকতায় মাত্র ১০টি গাড়ি সরানো সম্ভব হলেও বাকি ৩০টিরও বেশি গাড়ি পুড়ে এখন কঙ্কালসার লোহার কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
তেমনই এক ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিক রফিকুল ইসলাম। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করে মাত্র আড়াই মাস আগে গাড়িটি নতুন করে প্রস্তুত করেছিলাম। অনেক আশা ছিল এই সিজনে ভালো আয় হবে। কিন্তু মুহূর্তের আগুনে সব ছাই হয়ে গেল। এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব, আর কীভাবে সংসার চলবে—তা কেবল আল্লাহ জানেন।’ রফিকুলের মতো আরও অনেক গ্যারেজ মালিক ও চালক এখন দিশেহারা।
সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব মুন্নী বেগম
গ্যাস পাম্পের ঠিক পেছনেই ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেখানেই সপরিবারে থাকতেন মুন্নী বেগম। আগুন ছড়িয়ে পড়ার খবর পেয়ে সন্তানদের নিয়ে কোনোমতে এক কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও রক্ষা করতে পারেননি তিল তিল করে জমানো সম্পদ। চোখের সামনেই পুড়ে গেছে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই।
আবেগজড়িত কণ্ঠে মুন্নী বেগম বলেন, ‘ঘরের ভেতরে রাখা ৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার আর নগদ ৩ লাখ টাকা—সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুধুমাত্র জীবনটা নিয়ে ফিরতে পেরেছি। এখন আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ মুন্নী বেগমের মতো আরও বেশ কয়েকটি পরিবার তাদের আসবাবপত্র ও ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে।
নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, বন্ধ রয়েছে রান্নার চুলা
অগ্নিকাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় গ্যাস পাম্প এলাকায় অবস্থান নিয়েছে সেনাবাহিনী (Army)। ফায়ার সার্ভিস (Fire Service) ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন আশেপাশে কেউ আগুন না জ্বালান। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে গত রাত থেকে রান্নার চুলা জ্বালাতে পারছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন জানান, আগুনের তীব্রতা আর পরবর্তী গ্যাস লিকেজের আশঙ্কায় তারা এখনো ঘরের ভেতরে স্বাভাবিক হতে পারছেন না। রাতের সেহরিও তারা সেরেছেন অন্য এলাকার আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত আতঙ্ক কাটছে না স্থানীয় জনপদে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও বর্তমান পরিস্থিতি
বৃহস্পতিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সহায়তার আশ্বাস দেন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণে একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি যাচাই শেষে সরকারি তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের এই গ্যাস পাম্পে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর মোট ৯টি ইউনিটের দীর্ঘ ৭ ঘণ্টার বিরামহীন প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় ধরণের বিস্ফোরণ এড়ানো গেছে, তবে এই দুর্ঘটনায় ইতোমধ্যে ১০ জন দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।