ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তি এখন আর কেবল শখের বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। সম্প্রতি বৈশ্বিক ইন্টারনেট অবকাঠামো এবং এতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে সমুদ্রতলের কেবল কীভাবে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
স্যাটেলাইট বনাম সাবমেরিন কেবল: ল্যাটেন্সি ও সক্ষমতা অনেকেই মনে করেন স্যাটেলাইট যুগে তারের প্রয়োজনীয়তা কমেছে, যা একটি ভুল ধারণা। স্যাটেলাইট সিগন্যাল যাতায়াতে বিলম্ব বা ল্যাটেন্সি বেশি হওয়ায় উচ্চগতির আর্থিক লেনদেন বা তাৎক্ষণিক ডাটা প্রক্রিয়াকরণে এটি কার্যকর নয়। অন্যদিকে, ফাইবার অপটিক কেবল আলোর গতিতে ডাটা পরিবহন করে এবং কয়েক টেরাবিট পর্যন্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করে। ফলে এটি অধিক স্থিতিশীল ও ব্যয়সাশ্রয়ী।
ডাটা এখন নতুন শক্তি: বৈশ্বিক রাজনীতি ও বিনিয়োগ বর্তমান বিশ্বে ডাটা বা তথ্যকে তেলের চেয়েও মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একটি বড় সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের পেছনে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়। যে রাষ্ট্র বা জোট এই ডাটা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। তাই বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিজস্ব কেবল স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাবনা বাংলাদেশ বর্তমানে SEA-ME-WE-5 এবং SEA-ME-WE-6 কেবল ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক ল্যান্ডিং স্টেশনটি বাংলাদেশের ডাটা মহাসড়কের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সম্প্রচার কাজে ব্যবহৃত হলেও, উচ্চগতির ইন্টারনেটের জন্য সাবমেরিন কেবলই প্রধান ভরসা। এই অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ডাটা হাবে পরিণত হতে পারে।
সুশাসন ও ডিজিটাল রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নিজে সুশাসন তৈরি করতে পারে না, তবে এটি সুযোগ তৈরি করে। ই-টেন্ডার বা ডিজিটাল পেমেন্ট দুর্নীতি কমাতে সহায়ক হলেও এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতিমালা ও জবাবদিহিতা। দক্ষ জনবল তৈরি এবং গ্রামীণ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এই অবকাঠামোর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সাবমেরিন কেবলের ওপর একক নির্ভরতা বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিকল্প রুট এবং একাধিক সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। সাইবার নিরাপত্তা এবং ডাটা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ডাটা কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কারা এটি নিয়ন্ত্রণ করছে, তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলাদেশকে সামনের দিনগুলোতে বহুমুখী সংযোগ, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং ডিজিটাল রূপান্তরকে সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ ডাটা প্রবাহ যেখানে যায়, শক্তির ভারসাম্য সেদিকেই সরে যায়।