বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোট প্রদান ও গণনা প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভয়মুক্ত। নির্বাচন পরবর্তী এই সময়ে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য।
ভোটের হার ও ভোটারদের ভূমিকা বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে 'ফেন্স সিটার' বা দোদুল্যমান ভোটারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৪.৫ শতাংশ ভোটার যারা কোনো নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে ছিলেন না, তাদের সিদ্ধান্তই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের একটি বড় ভোটব্যাংক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ধীরগতির ভোটগ্রহণ এবং সহিংসতার আশঙ্কায় নারী ও বয়স্ক ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও সাধারণ মানুষের মাঝে নির্বাচন নিয়ে ছিল ঈদের আমেজ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নির্বাচনের আগের রাতে দেশের কিছু এলাকায় বিশৃঙ্খলার চেষ্টা চললেও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় যৌথবাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে নির্বাচনকে প্রশ্নাতীত রাখা। নির্বাচন বিশ্লেষক এস এম আবুল বরকত আকাশের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নাশকতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল, তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ: বিএনপি বনাম জামায়াত নির্বাচনী মাঠে বিএনপির নিরঙ্কুশ আধিপত্য দেখা গেলেও জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত অবস্থান এবং প্রাপ্ত আসন সংখ্যা রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ২টি আসন পাওয়া জামায়াত এবারের নির্বাচনে ৬৯টি আসন লাভ করেছে। গবেষকদের মতে, এটি দলটির ইতিহাসে একটি বিরল অর্জন। তবে এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এবং জোটের অভ্যন্তরীণ জটিলতা জামায়াতকে প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে বাধা দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ বিএনপি এই নির্বাচনে ২৫০টির মতো আসনে জয়লাভের পথে রয়েছে, যা তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফসল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জামায়াতকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কতটা সুযোগ দেওয়া হবে বা আওয়ামী লীগের অবর্তমানে রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সরকারের ডাক দেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গণতন্ত্রের নবজন্ম প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই দিনটিকে 'বাংলাদেশের জন্মদিন' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলেও তার গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।