• মতামত
  • জনগণ ভোট দিল, ফলাফলের এ কী হলো: গণতন্ত্রের মালিকানা ও অদৃশ্য কারিগরদের আখ্যান

জনগণ ভোট দিল, ফলাফলের এ কী হলো: গণতন্ত্রের মালিকানা ও অদৃশ্য কারিগরদের আখ্যান

ভোটের প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অদৃশ্য প্রভাব নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন

মতামত ১ মিনিট পড়া
জনগণ ভোট দিল, ফলাফলের এ কী হলো: গণতন্ত্রের মালিকানা ও অদৃশ্য কারিগরদের আখ্যান

বাংলাদেশে সংবিধান অনুযায়ী জনগণই ক্ষমতার মালিক। কিন্তু ভোটের প্রক্রিয়া যদি প্রভাবিত হয় এবং অদৃশ্য ইশারায় ফলাফল নির্ধারিত হয়, তবে সেই মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও যখন সেখানে কারিগরি ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষক রহমান মৃধা তাঁর বিশ্লেষণে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং নাগরিক অধিকারের সংকটগুলো তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জনগণই ক্ষমতার মালিক’—এই কথাটি বহুল প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যখন প্রভাব বিস্তার, ফলাফল কারচুপি বা অদৃশ্য শক্তির নির্দেশনা কাজ করে, তখন এই মালিকানা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি এবং এর স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

গণমাধ্যমের বিভ্রান্তি ও তথ্যের স্বচ্ছতা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। কিন্তু যখন গণমাধ্যম আংশিক বা বিকৃত তথ্য প্রচার করে, তখন সাধারণ মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং তথ্য উন্মুক্তকরণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ অপরিহার্য। রাজনৈতিক বা কর্পোরেট প্রভাবমুক্ত হয়ে সত্য প্রকাশ করাই গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।

প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও কারিগরি কারচুপি নির্বাচনের সময় প্রশাসনের ভূমিকা প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে। মৌখিক ঘোষণা দিয়ে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং প্রকাশ্য প্রতিবেদন। এছাড়া প্রযুক্তিগত ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও স্বাধীন বিচারিক কমিশনের মাধ্যমে কারচুপির অভিযোগগুলো যাচাই করা জরুরি। যখন জনগণের সরল ভোটকে বিশেষজ্ঞরা ‘সমন্বয়’ বা ‘সংস্কার’ করে ফলাফল বদলে দেন, তখন তাকে ভোটের চেয়ে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলাই শ্রেয়।

বহিরাগত প্রভাব ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যদি কোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শক্তি প্রভাব ফেলে, তবে জনগণের ভোটাধিকার বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত না হলে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং সংসদীয় নজরদারি ছাড়া এই প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন।

প্রতিরোধের উপায় ও নাগরিক সচেতনতা নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি: ১. প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা: ভোট গণনায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও স্বাধীন অডিট। ২. প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা। ৩. গণমাধ্যম সংস্কার: মালিকানা ও অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ৪. নাগরিক অংশগ্রহণ: ভোট পর্যবেক্ষণে সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকা।

উপসংহার: মালিকানা কি কেবল স্লোগান? রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি নাগরিকদের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অধিকারের ক্ষেত্র। প্রশ্ন তোলা কোনো বিদ্বেষ নয়, বরং গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। ব্যক্তিগত সুবিধা বা ভয়ের কারণে সত্য উচ্চারণ থেকে পিছিয়ে থাকা একটি নৈতিক ব্যর্থতা। বাংলাদেশ তখনই প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হবে, যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নাগরিক অধিকারকে সবার আগে অগ্রাধিকার দেবে।

Tags: bangladesh election democracy transparency voting rights political analysis public-opinion