জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণকারী নতুন সরকারের জন্য প্রথম ১২০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল প্রশাসনিক রুটিন কাজ নয়, বরং আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের সময়। অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি এই সময়েই স্থাপন করতে হয়।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। কেবল বাজার তদারকি বা ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ‘ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্রেমওয়ার্ক’। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা চিহ্নিত করা জরুরি। শুল্ক-ভ্যাট সমন্বয় এবং কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা এই ক্ষেত্রে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ও সংস্কার ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা নতুন সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা। খেলাপি ঋণ ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব এই খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রথম ১২০ দিনেই একটি স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বোর্ড গঠন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত পৌঁছাবে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও এআই ডিপ্লোমেসি বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় সাইবার রেসপন্স টাস্কফোর্স গঠন এবং তথ্য সুরক্ষা আইন শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, ‘এআই ডিপ্লোমেসি’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উন্নত দেশগুলোর সাথে প্রযুক্তি সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির সক্ষমতা অর্জন এবং একটি ন্যাশনাল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার রোডম্যাপ তৈরি করা সময়ের দাবি।
বাণিজ্য সংগঠন ও এফবিসিসিআই-এর ভূমিকা দেশের অর্থনীতিতে ব্যবসায়ী সমাজের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এফবিসিসিআইসহ সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। নির্বাচিত ও যোগ্য ব্যবসায়ী নেতৃত্ব নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটাতে পারে, যা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপকে আরও শক্তিশালী করবে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বৈষম্য নিরসন স্বাস্থ্য খাতে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমাতে উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিন এবং ডিজিটাল ওষুধ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। শিক্ষা খাতে ‘লার্নিং রিকভারি প্রোগ্রাম’ এবং কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা জরুরি। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
দক্ষ অভিবাসন ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ‘স্কিলড মাইগ্রেশন’ বা দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, আইটি এবং কেয়ার ইকোনমি সেক্টরে দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্সের গুণগত মান ও পরিমাণ দুই-ই বাড়বে। এর জন্য একটি ন্যাশনাল স্কিলড মাইগ্রেশন রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন।
সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং মেধাভিত্তিক পদোন্নতি নীতি অনুসরণ করা উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করা সম্ভব।
পরিশেষে, প্রথম ১২০ দিন কোনো জাদুকরি সমাধানের সময় নয়, বরং এটি একটি শক্ত ভিত নির্মাণের সুযোগ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সাহসী সংস্কারের মাধ্যমে নতুন সরকার জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে।