বাংলাদেশের আন্তজার্তিক নদীর সংখ্যা ৫৭টি হলেও ভারতের সাথে আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে কেবল একটি নদীর—পদ্মা (ভারতে যা গঙ্গা নামে পরিচিত)। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হচ্ছে না, কেনই বা চুক্তি আলোচনা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে, আর ফুরিয়ে আসা গঙ্গা-চুক্তির আদৌ নবায়ন হবে কি না, তা বুঝতে হলে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সময়কালকে পর্যালোচনা করতে হবে।
যৌথ নদী কমিশন ও প্রাথমিক উদ্যোগ
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জুন মাসে সর্বপ্রথম ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (Joint Rivers Commission) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই কমিশনের প্রধান কাজ ছিল দুই দেশের মধ্যে লিয়াজোঁ বজায় রেখে নদী-শাসন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তৈরি ও প্রণয়ন করা এবং যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বন্যার পূর্বাভাস প্রদান করা।
তিস্তা চুক্তি: বারবার ব্যর্থতার গল্প
১৯৮৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের উদ্যোগেও তিস্তা পানিচুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও তা ভেস্তে যায় রাজনৈতিক কারণে। কূটনৈতিক সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে সরকারি খরচে তিস্তা ব্যারেজ তৈরি করে, যার ফলে শাখা নদী ও খালের পানি ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটে। তবে এর জবাবে ভারত ১৯৯৬ সালে তিস্তা ব্যারেজ থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে জলপাইগুড়িতে আরও বৃহদাকার গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ করে, যা তিস্তার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়।
তিস্তার ওপর নির্ভরশীল মানুষের একটি পরিসংখ্যান দেখলে এই সমস্যার গভীরতা স্পষ্ট হয়। তিস্তার উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম রাজ্যে মাত্র ২% মানুষ নির্ভরশীল, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ২৭% মানুষ নির্ভরশীল। অথচ ভাটির দেশ বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লক্ষ বা ৭১% মানুষ তিস্তার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। গজলডোবা ব্যারেজ তৈরির ফলে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ (প্রায় ৬০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার) খরা মৌসুমে নেমে আসে মাত্র ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটারে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ একটি খসড়া প্রস্তাবনা দেয়, যেখানে ভারত ৪০%, বাংলাদেশ ৪০% এবং ২০% পানি ন্যায্যতার ভিত্তিতে বন্টনের কথা বলা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রাজি থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি শেষ মুহূর্তে সই করতে রাজি হননি। ফলে দীর্ঘ ৫৪ বছরেও তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন সম্ভব হয়নি।
গঙ্গা-চুক্তি ও তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
দীর্ঘ ত্রিশ বছরের চেষ্টার ফলে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত একমাত্র আন্তর্জাতিক চুক্তি, **‘গঙ্গা-চুক্তি’**তে আবদ্ধ হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী খরা মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) ভারত সরকার আইনগতভাবে অন্তত ৩৫,০০০ কিউসেক পানি দিতে বাধ্য। কিন্তু রাজনৈতিক উদাসীনতা ও অসহযোগিতার কারণে ভারত কখনই গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়নি। বাংলাদেশের বৃহত্তম পদ্মা নদী (যা গঙ্গা নামে পরিচিত) দেশের ২১টি জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের চুক্তি অমান্য করে পানি আটকে রাখার ফলে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর আবাদী জমি ও খাল-বিল সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশের বিখ্যাত জিকে খাল প্রকল্পের (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) ৯৩% শতাংশই এখন সম্পূর্ণ পতিত জমিতে পরিণত হয়েছে।
এই ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা-চুক্তির মেয়াদ এবছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়ন না হলে বাংলাদেশের গঙ্গার পানি আদায়ের আর কোনো আইনগত ভিত্তি থাকবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
তিস্তা ও পদ্মা ছাড়াও দুই দেশের সাথে যুক্ত ৫২টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৩৮টির ৩৬টিতেই অবৈধ বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করে নদীর প্রাকৃতিক গতিপ্রকৃতি আটকে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পানি এখন সম্পদে নয়, বরং অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। নদী, হাওর ও পানি ব্যবস্থাপনায় ভারতের অসহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের বাৎসরিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কৃষি জমির পরিমাণ হ্রাস, নদীর নাব্যতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি, মৌসুমি বন্যা, খরা ও বাস্তুহারা হওয়া অন্যতম। একটি গবেষণা অনুযায়ী, তিস্তায় ক্রমাগত বাঁধের ফলে শুধু রংপুরেই ৩,০০০-এরও অধিক চর জেগেছে এবং প্রায় ৫,০০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অন্যান্য উদ্যোগ ও চীনের ভূমিকা
ভারতের সহযোগিতা না পাওয়ায় বাংলাদেশ সম্প্রতি চীনের কাছে ৫০ বছর মেয়াদি তিস্তা মহাপ্রকল্পের রোডম্যাপ চেয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে চীন থেকে ২১০ কোটি টাকা অনুদান ও বিভিন্ন মেয়াদে ঋণও নিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এই প্রকল্প নদীমাতৃক দেশের জন্য কতটা লাভজনক হবে, এবং তা বাস্তবায়ন ও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। একই সাথে, চীনা ঋণের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে কূটনীতিক সম্পর্কের আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যতের পথ
বাংলাদেশের প্রয়োজনই যেহেতু বেশি, তাই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে আবারও নদী-কেন্দ্রিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কোনো বিকল্প নেই। গঙ্গা-চুক্তির পুনঃমূল্যায়ন এবং অভিন্ন নদীসমূহের প্রাপ্য হিস্যা আদায় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দু-দেশের মধ্যকার সমতার সম্পর্ক সৃষ্টি করা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা কি আদৌ ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত? দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সমস্যার কূটনৈতিক সমাধান করতে আগ্রহী? কিংবা গঙ্গা-চুক্তি নবায়ন নিয়ে আদৌ রাষ্ট্রীয় কোনো পরিকল্পনা আছে? সে প্রশ্ন রয়েই যায়।