রাজনৈতিক অঙ্গনের দীর্ঘ অস্থিরতা ও চলমান অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে ভোটারদের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন তুলে ধরতেই এই কৌশল নিয়েছে দল দুটি।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান এই দুই দলের ইশতেহারেই অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে বড় লক্ষ্য ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগোনোর রূপরেখা তুলে ধরেছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী আরও উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা—এই চারটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপন করেছে উভয় দল। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয়; এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট পথনকশা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি নয়— বাস্তব নীতিগত সিদ্ধান্ত, সংস্কারের ধারাবাহিকতা এবং সুশাসনের বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তব পরীক্ষা শুরু হবে—যেখানে অর্থনীতিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার ক্ষেত্র।
২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য বিএনপির
বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে এই লক্ষ্যসহ অর্থনীতি পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
ইশতেহারে বলা হয়, জনগণের ভোটাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে কূটনীতিক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থনীতির কেন্দ্রে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন
ইশতেহারে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইসিটি খাতে এক মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি। পাশাপাশি তরুণদের জন্য কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দলটি জানিয়েছে, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণে আঞ্চলিক ই-কমার্স হাব গড়ে তোলা হবে এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম, যেমন- পেপাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজস্ব কাঠামো সংস্কার, কর না বাড়িয়েই আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা
বিএনপির ইশতেহারে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৭ শতাংশের নিচে। তবে করের বোঝা না বাড়িয়ে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষায় সরাসরি সহায়তা
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এর আওতায় প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের জন্য থাকছে ‘ফারমার্স কার্ড’, যার মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য, ভর্তুকি, কৃষিঋণ, বিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এই সুবিধা মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হবে।
বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও সবুজ অর্থনীতি
ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে এবং সঞ্চালন লাইন বাড়ানো হবে ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় থ্রি-আর (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল) নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
সৃজনশীল অর্থনীতিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির নতুন খাত হিসেবে চিহ্নিত করে বিএনপি জানিয়েছে, চলচ্চিত্র, সংগীত, থিয়েটার, অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স, গেমিং ও ডিজিটাল কনটেন্ট খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাত থেকে জিডিপির ১.৫ শতাংশ অবদান এবং ৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে।
সামগ্রিক লক্ষ্য
ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিএনপির লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা। দলটির ভাষায়—“উৎপাদন, লুট নয়; অধিকার, ভয় নয়; ন্যায়বিচার, বৈষম্য নয়— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।”
বিএনপি আশা করছে, জনগণের ম্যান্ডেট পেলে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির বাংলাদেশ গড়ার এই রূপরেখাই হবে তাদের শাসনকালের মূল দিকনির্দেশনা।
বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘বিএনপি তাদের ইশতেহারে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আমাদের যেটা বড় একটা ইস্যু ছিল যে নীতির ক্ষেত্রে যে ধরনের ‘অশুভ নিয়ন্ত্রণ’ ছিল, তার পুনরাবৃত্তি হবে না, এটাকে প্রতিরোধ করা হবে। এটার ব্যাপারে ওনাদের প্রতিশ্রুতির কথা ওনারা বলেছেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘দ্বিতীয়ত, মধ্যবর্তী অর্থনীতির দিকে কোন কোন বিষয়গুলো জোর দিতে হবে, সেই বিষয়গুলো ওনারা স্পষ্টভাবেই মোটামুটি বলেছেন। হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে ওনারা কর্মসংস্থানে জোর দিয়েছেন, আইসিটি ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন। এগুলোর ওপর ওনারা ফোকাস রেখেছেন। তৃতীয়ত, যেটা হয়তো ভিন্নতরভাবে এসেছে, সেটা হলো আমাদের নীতির ভেতরে ধারাবাহিকতার কথা বলেছেন এবং এটার ভেতরে এক ধরনের প্রেডিক্টেবল কথা বলেছেন, যেটা হঠাৎ করে ঘন ঘন চেঞ্জ হয়ে যায়। এটা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার কাছে মনে হয়েছে, অর্থনীতির এখন যে সংকটকালীন সময় যাচ্ছে, তার বড় কারণ ছিল দুটো, একটা হলো এটার ভেতরে গোষ্ঠী স্বার্থ ছিল। দ্বিতীয় হলো, যে লক্ষ্যগুলাকে বা পরিকল্পনাগুলো বিভিন্ন সময় আগের সরকারগুলো নিয়েছেন, সেগুলোকে ওনারা আসলে কাগজপত্রে অনেক ভালো কথা ছিল, বাস্তবে করতে পারেন নাই। তো বিএনপির এই ইশতেহারে এই দুটো ক্ষেত্রে ওনারা স্পষ্টভাবে ওনাদের অবস্থান বলেছেন, একটা হলো যে ওনারা নীতির ক্ষেত্রে গোষ্ঠী স্বার্থকে পরিহার করবেন এবং এই ঘন ঘন নীতি যেকোনও সময় পরিবর্তন হবে না, এটা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবেন। ’’
তার মতে, বিএনপির ইশতেহারে ইমিডিয়েট ইকোনমি রিপেয়ারমেন্টের জন্য যে স্টেপগুলো, এটা এখনও স্পষ্টভাবে আসেনি। তাদের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার ভেতরে কিছু প্রতিশ্রুতি আছে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু আর্জেন্ট স্টেপের দরকার হবে, সেটা খুব দ্রুত স্পষ্ট করে এখানে বের হয়ে আসেনি। আমি আরেকটা জিনিস ওনাদের ইতিবাচক দেখি, ওনারা বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে রাজস্ব আহরণের একটা গুরুত্ব আছে, এটাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করছেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে অর্থনীতির মধ্যকার বৈষম্যের বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসছেন, অনেক স্পষ্টভাবে।’’
জায়াতের ইশতেহার: ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
এর আগে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে ৪১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেখানে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতি এসেছে অর্থনীতি ঘিরে। দলটি ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তম অর্থনীতিতে উত্তরণের কথাও বলা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে আগামী দেড় দশকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে উচ্চমাত্রায় ধরে রাখা, বিনিয়োগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা ছাড়া বিকল্প নেই।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ: উচ্চ লক্ষ্য, কঠিন পথ
ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আধুনিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জামায়াত। পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা ৩০ শতাংশ কমানোর কথাও বলা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের এফডিআই প্রবাহ বার্ষিক ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে প্রস্তাবিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং আর্থিক খাতে আস্থার সংকট দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
দলটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধাপে ধাপে ৭ শতাংশে উন্নীত করার কথা বললেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রফতানি বাজারের চাপ ও জ্বালানি আমদানি নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে এই প্রবৃদ্ধি টেকসইভাবে ধরে রাখা সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
করনীতি ও রাজস্ব: স্বস্তি না চাপ?
জামায়াতের ইশতেহারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা এবং করপোরেট কর হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে করদাতাদের স্বস্তি মিললেও রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই।
বর্তমানে জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের কর-রাজস্ব আহরণের হার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম কম। করহার কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে কর প্রশাসনের গভীর সংস্কার ও কর জালের বিস্তৃতি অপরিহার্য হবে।