আলো জ্বালানোর সাহসী পদক্ষেপ
ছয় দশক আগে যখন বেগম খালেদা জিয়া ম্যাট্রিক পাস করেন, তখন বাংলাদেশে মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত— মাত্র ২% মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা পেত। পরিবারে ছেলেদের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়া হতো এবং মেয়েদের লেখাপড়ায় অর্থ খরচ করা অপ্রয়োজনীয় মনে করা হতো। স্বাধীনতার পরও নারী শিক্ষার এই করুণ চিত্র অব্যাহত ছিল। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার ছিল মাত্র ২৮ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া নারী শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন। তিনি বলতেন, 'মেয়েরা শিক্ষিত হলে পরিবার শিক্ষিত হয়, সমাজ শিক্ষিত হয়, দেশ এগিয়ে যায়।'
FSSAP: নারী শিক্ষার মূল ভিত্তি
খালেদা জিয়ার সেই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় তার সবচেয়ে বড় কর্মসূচি— Female Secondary School Assistance Program (FSSAP) বা মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) অংশগ্রহণ বাড়ানো। কর্মসূচিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল:
- মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে টিউশন ফি।
- মাসিক উপবৃত্তি।
- নিয়মিত উপস্থিতি (৭৫ শতাংশ ক্লাস), ভালো ফলাফল (৪৫ শতাংশ নম্বর) এবং অবিবাহিত থাকার শর্ত।
- বই ও পরীক্ষার ফির মতো সহায়তাসমূহ।
এই কর্মসূচির ফল ছিল অভূতপূর্ব। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি মেয়েদের মাধ্যমিক ভর্তির হার ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, ঝরে পড়ার হার কমে এবং বাল্যবিবাহের হার হ্রাস পায়। এডিবি-এর ২০২২ সালের রিপোর্টে এই প্রোগ্রামটিকে তার খরচের চেয়ে ২০০ শতাংশ বেশি সফল বলে উল্লেখ করা হয়। এই মডেলটি ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছিল।
প্রাথমিক শিক্ষায় বিপ্লব
বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র মাধ্যমিক স্তরেই থেমে থাকেননি। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করান। তিনি 'শিক্ষা-খাদ্য (Food for Education) প্রোগ্রাম' সম্প্রসারণ করেন, 'প্রাথমিক শিক্ষা বৃত্তি/উপবৃত্তি প্রোগ্রাম' চালু করেন এবং 'বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন' প্রণয়ন করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকদের জন্য কোটা বাড়ানো হয় এবং ১৭ হাজার নতুন স্কুল নির্মাণ/সংস্কার করা হয়।
এই উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৯৭%-এ পৌঁছায় এবং লিঙ্গ সমতা (gender parity) অর্জিত হয়। ২০০২ সালে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান নিউইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে বাংলাদেশের এই উপবৃত্তি কর্মসূচির প্রশংসা করে বলেন, 'এই উপবৃত্তি অলৌকিক কাজ করেছে: মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি ৩৩ থেকে বেড়ে ৫৬ শতাংশ হয়েছে এবং লিঙ্গ বৈষম্য প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।'
একটি জাতির মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৫ সালে নারীদের অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে 'বেগম রোকেয়া পদক' প্রবর্তন করেন এবং মেয়েদের জন্য দুটি গার্লস ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করেন। আজ তৈরি পোশাক (RMG) খাতে লক্ষ লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান, অর্থনীতিতে তাদের অবদান, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস এবং সিভিল সার্ভিস, শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ— সবই সেই নারী শিক্ষা আন্দোলনের ফল।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে নারী শিক্ষা কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি জাতি গঠন এবং জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি একটি সমাজের মনস্তত্ত্ব বদলে দিয়েছিলেন। যতদিন বাংলাদেশে মেয়েরা স্কুলে যাবে, ততদিন বেগম খালেদা জিয়ার নাম সেই আলোকিত পথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। আজ যারা নারীকে ঘরে বন্দি করে রাখতে চায়, তারা পরোক্ষভাবে নারীর অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে চায়।