• মতামত
  • ইতিহাসের মীমাংসিত ইস্যুগুলোকে বিতর্কিত করবেন না: নির্বাচনী বাগ্‌যুদ্ধ ও স্বাধীনতা ঘোষণা

ইতিহাসের মীমাংসিত ইস্যুগুলোকে বিতর্কিত করবেন না: নির্বাচনী বাগ্‌যুদ্ধ ও স্বাধীনতা ঘোষণা

নির্বাচনী বাগ্‌যুদ্ধে এলডিপিপ্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের প্রথম বিদ্রোহের দাবি উঠলেও, প্রামাণিক দলিল ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা করাই প্রতিষ্ঠিত সত্য। মীমাংসিত ইতিহাসকে বিতর্কিত না করার আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক।

মতামত ১ মিনিট পড়া
ইতিহাসের মীমাংসিত ইস্যুগুলোকে বিতর্কিত করবেন না: নির্বাচনী বাগ্‌যুদ্ধ ও স্বাধীনতা ঘোষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ চরমে উঠলেও, ইতিহাসে মীমাংসিত বিষয়—বিশেষ করে স্বাধীনতা ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে বিতর্কিত করার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। এলডিপিপ্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ কর্তৃক 'উই রিভোল্ট' বলার দাবি নতুন করে উঠলেও, প্রামাণিক দলিল ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহই প্রতিষ্ঠিত সত্য। নির্বাচনী প্রচারে ব্যক্তিগত আক্রমণ চলুক, তবে জাতির ঐক্য ও ভিত্তির প্রতীক স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত সত্য নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়া অনুচিত।

নির্বাচনী বাগ্‌যুদ্ধে নতুন বিতর্ক

প্রকৃতির মাঘ মাসের শীতের অনুভূতি না থাকলেও, দেশের রাজনীতির মাঠ ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রচারণায় ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে প্রতিপক্ষের ওপর 'বাগাস্ত্র' নিক্ষেপ চললেও, এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের নিষ্পত্তি হওয়া ইস্যুকে সামনে এনে বিতর্কিত করার একটি অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ১১-দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে বলেছেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সবার আগে 'উই রিভোল্ট' বলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন এবং তিনি জিয়াউর রহমানকে সামনে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

অলি আহমদের ভূমিকা ও তাঁর নিজের বয়ান

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর ভূমিকা জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি নিজেও কখনও সরাসরি দাবি করেননি যে, তিনিই প্রথম 'উই রিভোল্ট' বলে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। লেখক তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন যে, ওয়ান-ইলেভেনের আগে কর্নেল অলি আহমদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং তাঁর লিখিত গ্রন্থেও তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য 'প্ররোচিত' করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থেও তিনি প্রথম বিদ্রোহের দাবি করেননি।

প্রতিষ্ঠিত সত্য: জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ

মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখিত বই ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, জিয়াউর রহমানই প্রথম 'উই রিভোল্ট' বলে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। বিশিষ্ট লেখক গোলাম মুরশিদ তাঁর 'মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে জিয়াই (জিয়াউর রহমান) সবার আগে বিদ্রোহ করেন। ষোলশহরের ঘাঁটিতে পৌঁছে তিনি পশ্চিমা সৈন্যদের নিরস্ত্র করে কমান্ডিং অফিসারকে গ্রেফতার করেন এবং রাত সোয়া দুটোয় কালুরঘাটের দিকে যাত্রা করেন।

এছাড়াও, মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীর সেনানী লে. জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী বীরউত্তম (১১ জানুয়ারি, ১৯৩৮-২০ নভেম্বর, ২০১০) তাঁর সাক্ষাৎকারে এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়ার মাঝপথে জিয়াউর রহমান ফিরে এসে বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ে 'উই রিভোল্ট' বলে বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনি ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে সৈন্যদের উদ্দেশে বক্তব্য রেখে বিদ্রোহ করেন, যা সেনা-নিয়ম অনুযায়ী উচ্চস্থানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার অংশ ছিল।

মীমাংসিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক কাম্য নয়

সুতরাং, প্রামাণিক দলিল এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুসারে এটি সত্য যে, কর্নেল অলি নন, জিয়াউর রহমানই 'উই রিভোল্ট' বলে বিদ্রোহ করে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েন। এই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে নতুন করে বিতর্কিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ চলুক, কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো জাতির মৌলিক মীমাংসিত বিষয়গুলোকে বিতর্কের মাধ্যমে দুর্বল করা কখনোই কাম্য নয়।

Tags: bangladesh election ziaur rahman liberation war political debate colonel oli ahmad we revolt history