• মতামত
  • সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা: নির্বাচনকে সামনে রেখে বিতর্ক সৃষ্টির ষড়যন্ত্র

সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা: নির্বাচনকে সামনে রেখে বিতর্ক সৃষ্টির ষড়যন্ত্র

ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে সেনাসদস্যদের বাদানুবাদের পুরোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি। নির্বাচনকে সামনে রেখে সেনাবাহিনীর ‘লাস্ট আরবিট্রার’ ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

মতামত ১ মিনিট পড়া
সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা: নির্বাচনকে সামনে রেখে বিতর্ক সৃষ্টির ষড়যন্ত্র

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি হলো জনগণের নিঃশর্ত আস্থা থাকা প্রতিষ্ঠানসমূহ, যার শীর্ষে রয়েছে সেনাবাহিনী। দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের প্রতীক এই বাহিনীকে নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জামায়াত প্রার্থীর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একটি মীমাংসিত ঘটনাকে নতুন করে ভাইরাল করে জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কারা, তা তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু মানচিত্রের সীমারেখা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর—যাদের ওপর জাতি নিঃশর্ত আস্থা রাখে। বাংলাদেশে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষে রয়েছে সেনাবাহিনী। যুদ্ধকালীন বীরত্ব থেকে শুরু করে দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় গৌরব—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই জনগণের কাছে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।

বিতর্ক সৃষ্টির নেপথ্যে: পুরোনো ক্ষত ও নতুন প্রোপাগান্ডা

যদিও একসময় পতিত স্বৈরাচারী শাসনের দীর্ঘ সময়জুড়ে কিছু কর্তৃত্বপরায়ণ কর্মকর্তার পেশাদারিত্ববহির্ভূত কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনীর সামষ্টিক ভাবমূর্তিতে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তবুও সেই অপরাধগুলো ছিল ব্যক্তিবিশেষের, পুরো বাহিনীর নয়। এর সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের অনেকেই আইনের আওতায় এসেছেন। তবে বর্তমানে, একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। প্রবাসে বসে কিছু ইউটিউবার ও কথিত সাংবাদিক গত এক-দেড় বছরে সেনাবাহিনীকে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন মিথ্যাচারের 'ন্যারেটিভ' তৈরি করেছে, যার উদ্দেশ্য সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দেওয়া। এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মাধ্যমের 'অ্যালগরিদম' ও আবেগী রাজনীতির কারণে এই গুজব কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।

ঢাকা-১৭ আসনের ঘটনা: এক মীমাংসিত ইস্যুর পুনরাবৃত্তি

ঠিক এমন এক সংবেদনশীল সময়ে, নির্বাচন থেকে মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়—তিনি গানম্যানসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী বাধা দিলে দায়িত্বরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্-বিতণ্ডায় জড়ান। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন—ঘটনাটি তখনই সমাধান হয়েছিল এবং সেনাবাহিনীর কাছে এটি মীমাংসিত ইস্যু। তাহলে প্রশ্ন হলো—এই বিতর্ক নতুন করে উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী? ক্যান্টনমেন্টে নিয়ম ভাঙার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পেছনে কোনো দীর্ঘদিনের 'ন্যারেটিভ ব্যাটেলের' প্রতিফলন রয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনকালীন সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

এই অস্থির প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য সারা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়। প্রায় এক লাখ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা এবং নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি সব মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনী একটি আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণের মধ্যে আবার আস্থা ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা আবশ্যক

সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার এই অপচেষ্টা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্যান্টনমেন্টের ভিডিও ফাঁসের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত। কারা, কী উদ্দেশ্যে, কোন চ্যানেলে এটি প্রকাশ করেছে—সবকিছু জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া দরকার। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ষড়যন্ত্র আরও বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে তার চিরাচরিত পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রমাণ করতে হবে—এই বাহিনী কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়; এই বাহিনী কেবল বাংলাদেশের।

Tags: politics election national security bangladesh army propaganda dr. khaliduzzaman