• মতামত
  • ভালো সংসদ ও খারাপ সংসদ: গণতন্ত্রের রক্ষক নাকি ক্ষয়কারী?

ভালো সংসদ ও খারাপ সংসদ: গণতন্ত্রের রক্ষক নাকি ক্ষয়কারী?

সংসদীয় গণতন্ত্রে স্পিকারের ভূমিকা ও নেতৃত্বের রাজনৈতিক নৈতিকতা কীভাবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তার একটি বিশ্লেষণধর্মী চিত্র।

মতামত ১ মিনিট পড়া
ভালো সংসদ ও খারাপ সংসদ: গণতন্ত্রের রক্ষক নাকি ক্ষয়কারী?

সংসদ বা পার্লামেন্ট একেক দেশে একেক রূপ ধারণ করে। কোথাও এটি গণতন্ত্রকে সুসংহত করে, আবার কোথাও স্বৈরশাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সংসদ যেমন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হতে পারে, তেমনি কখনও কখনও তা কেবল ধনী বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। মূলত সংসদের চরিত্র এবং স্পিকারের ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয় তা গণতন্ত্রের রক্ষক হবে নাকি ঘাতক।

পার্লামেন্ট বা সংসদ একেক দেশে একেকভাবে কাজ করে। কোথাও তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, কোথাও স্বৈরশাসনকে টিকিয়ে রাখে। কখনো এটি ধনী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে, আবার কখনো শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, সংসদ একই সঙ্গে গণতন্ত্রের রক্ষকও হতে পারে, আবার তার ক্ষয়ও ঘটাতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতিতে সংসদের বিচিত্র ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের সংসদ একসময় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নিজ দেশেই দুর্বল ও একঘরে করে তুলেছিল। আবার রাশিয়ার সংসদের নিম্নকক্ষ স্টেট দ্যুমা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের ট্যাঙ্ক হামলার শিকার হয়েছিল। দ্যুমা তাকে অভিশংসন করলেও ইয়েলৎসিনের পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর সমর্থন। পশ্চিমা শক্তিগুলো তখন রাশিয়ার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর এই হামলাকে সমর্থন জানিয়েছিল, যা গণতন্ত্রের এক বিচিত্র রূপ।

স্পিকারের ক্ষমতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সংসদ পরিচালনা বা তাকে বিপথে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। জার্মান রাইখস্টাগের স্পিকারের ভূমিকাই অ্যাডলফ হিটলারকে অপ্রতিরোধ্য ‘ফ্যুরার’ বানাতে বড় ভূমিকা রাখে। নাৎসিদের কৌশল ছিল হারমান গোরিংকে রাইখস্টাগের সভাপতি করা; তার কৌশল ছাড়া হিটলারের পক্ষে চ্যান্সেলর হিসেবে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। স্পিকার হিসেবে গোরিং ‘এনাবলিং আইন’ পাস করিয়ে হিটলারকে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছিলেন।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও রাহুল গান্ধী বর্তমানে ভারতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলতে দিচ্ছেন না। সম্প্রতি রাহুল গান্ধীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আটকে দেওয়া একটি বইয়ের উল্লেখ করতে না দেওয়া নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভারতের ইতিহাসে ফিরোজ গান্ধীর মতো সংসদ সদস্যরা বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি উন্মোচন করেছিলেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁকে থামাননি।

রাহুল গান্ধী সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানের একটি বই নিয়ে আলোচনা চাইলে সরকার বইটির অস্তিত্ব অস্বীকার করে। অথচ রাহুল গান্ধী সেই বইয়ের কপি সংসদে দেখান। এই প্রেক্ষাপটে দিল্লি পুলিশ তথাকথিত “অস্তিত্বহীন বই” নিয়ে এফআইআর করেছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরল।

রাজনৈতিক নৈতিকতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সংসদ যেমন গণতন্ত্র রক্ষা করে, তেমনি তা খর্বও করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে রিচার্ড নিক্সন অভিশংসিত হয়ে পদত্যাগ করেছিলেন, আবার বিল ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প টিকে গিয়েছিলেন। ভারতে পি. ভি. নরসিমা রাও এবং অটল বিহারি বাজপেয়ির আমলেও সংসদীয় ক্ষমতার বিভিন্ন ব্যবহার দেখা গেছে।

সংসদে বই বা তথ্যের উদ্ধৃতি নতুন নয়। ১৯৫০ সালে দেবজ্যোতি বর্মণের ‘মিস্ট্রি অব বিড়লা হাউস’ বইটি বিড়লা পরিবারের সম্পদ ও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ব্যবসা নিয়ে সমালোচনামূলক অনুসন্ধান করেছিল। সেই বইয়ের অস্তিত্ব আজও টিকে থাকা অতীতের সংসদ সদস্যদের সততারই ফল। পরিশেষে বলা যায়, সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে নেতৃত্বের রাজনৈতিক নৈতিকতা ও স্পিকারের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর।

Tags: democracy indian politics global politics history parliament rahul gandhi