অমর একুশে বইমেলা আমাদের জাতীয় জীবনে এক আবেগের নাম। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুখরিত থাকে বইপ্রেমীদের কলতানে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির যে জয়জয়কার, তার ঢেউ লেগেছে আমাদের প্রকাশনা শিল্পেও। মুদ্রণ সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান বইমেলাকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বইমেলা ও বাঙালির আবেগ
বাঙালির প্রাণের মেলা হিসেবে পরিচিত অমর একুশে বইমেলা প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন বইয়ের জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই মেলা শুধু কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, বরং লেখক ও পাঠকের সেতুবন্ধন। তবে বর্তমান সময়ে কাগজের আকাশচুম্বী দাম এবং প্রকাশনা ব্যয়ের কারণে বইয়ের মূল্য সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিজিটাল মাধ্যম বনাম মুদ্রিত বই
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ই-বুক এবং অডিও বুক বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে পুরো একটি লাইব্রেরি বহন করার সুবিধা মুদ্রিত বইয়ের জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ভাগ বসিয়েছে। তবে বোদ্ধাদের মতে, কাগজের বইয়ের ঘ্রাণ আর পাতার স্পর্শ যে অনুভূতি দেয়, তা ডিজিটাল স্ক্রিনে পাওয়া অসম্ভব। তবুও সময়ের প্রয়োজনে প্রকাশকদের ডিজিটাল সংস্করণের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রকাশনা শিল্প
কাগজের দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রণ উপকরণের উচ্চমূল্য বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেক সৃজনশীল প্রকাশক টিকে থাকার লড়াই করছেন। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও বই বিক্রির আনুপাতিক হার নিয়ে অনেক সময় সংশয় দেখা দেয়। মেলাকে কেবল প্রদর্শনী নয়, বরং একটি টেকসই বাণিজ্যিক মডেলে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
নতুন প্রজন্মের পাঠকের রুচি
তরুণ পাঠকরা এখন ফিকশনের পাশাপাশি নন-ফিকশন, আত্মউন্নয়নমূলক বই এবং বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর দিকে বেশি ঝুঁকছে। তাদের এই রুচির পরিবর্তন মেলায় প্রকাশিত বইয়ের ধরনেও প্রভাব ফেলছে। মানসম্পন্ন অনুবাদ এবং গবেষণাধর্মী কাজের অভাব পূরণে লেখক ও প্রকাশকদের আরও যত্নশীল হতে হবে।
উপসংহার
বইমেলা আমাদের ঐতিহ্যের ধারক। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেলাকে আরও আধুনিক এবং পাঠকবান্ধব করে তুলতে হবে। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল আর্কাইভ এবং ই-বুক প্রসারে উদ্যোগ নিলে বইমেলা তার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে পারবে দীর্ঘকাল।