নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ৯ম পে-স্কেল (Pay Scale) বাস্তবায়নের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সিদ্ধান্তটি নবনির্বাচিত সরকারের ওপর ন্যস্ত করার পর থেকেই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এই প্রেক্ষাপটে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বিষয়টি নিয়ে প্রথমবারের মতো সরাসরি কথা বলেছেন নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাস্তবায়নের আগে নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আর্থিক সক্ষমতা বিচার
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বাস্তবসম্মত অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ৯ম পে-স্কেলের সুপারিশগুলো এখনো সরকারের গভীর পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "সুপারিশগুলো আমাদের বিশদভাবে দেখতে হবে। না দেখে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।"
অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, "আমাদের দেখতে হবে টোটাল এমাউন্ট (Total Amount) কত এবং এর কতটুকু এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান ট্যাক্স রেভিনিউ (Tax Revenue) এবং ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও (Tax-GDP Ratio) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যেকোনো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।"
বেতন কমিশনের সুপারিশ: কত বাড়তে পারে বেতন?
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন (National Pay Commission) গত ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে সেখানে ব্যাপক পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে যে মূল বিষয়গুলো উঠে এসেছে:
সর্বনিম্ন স্কেল: ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ।
সর্বোচ্চ স্কেল: ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব।
বাস্তবায়ন সময়কাল: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা, যদিও চলতি বছরের শুরু থেকেই আংশিক কার্যকরের একটি সুপারিশ রয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও তারেক রহমানের বার্তা
উল্লেখ্য, পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আগে থেকেই জোরালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি যথাসময়ে জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করবে। দলীয় ইশতেহারের সেই অঙ্গীকার এখন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কীভাবে সমন্বিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিন
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ (Challenge)। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস ওঠা সরকারি কর্মচারীদের তুষ্ট করা, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা করা—এই দ্বিমুখী চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রীকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। তবে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, সরকার হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং টেকসই ও যৌক্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি এগিয়ে নিতে চায়।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ম পে-স্কেল নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।