ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো অধ্যায়ের সূচনা করে গ্রেফতার হলেন রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর (প্রিন্স অ্যান্ড্রু)। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জেরে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা থাকার পর এবার সরাসরি ‘সরকারি পদে অসদাচরণ’ বা Misconduct in Public Office-এর অভিযোগে তাকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) টেমস ভ্যালি পুলিশের একটি বিশেষ দল নরফোকের স্যান্ডরিংহ্যাম এস্টেট সংলগ্ন তার বাসভবন থেকে তাকে গ্রেফতার করে। রাজপরিবারের কোনো সদস্যের এমন গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা আধুনিক ব্রিটেনের ইতিহাসে বিরল।
অভিযোগের ধরণ ও আইনি মারপ্যাঁচ
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কিছু প্রশাসনিক ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পদের অপব্যবহার এবং অসদাচরণের প্রমাণ মেলায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, Misconduct in Public Office একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধ, যেখানে কোনো ব্যক্তি তার সরকারি পদের অমর্যাদা করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল বা আইনের অবমাননা করেন। দীর্ঘদিনের ‘সতর্ক মূল্যায়ন’ এবং Legal Scrutiny বা আইনি পর্যালোচনার পর এই গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়।
পতন ও রাজকীয় তকমা হারানো
প্রিন্স অ্যান্ড্রু একসময় ব্রিটিশ রাজপরিবারের অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য এবং নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তার পতন শুরু হয়। ২০২২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তার সমস্ত রাজকীয় তকমা এবং সামরিক সম্মাননা কেড়ে নিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি মূলত ‘অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর’ হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনযাপন করছিলেন।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের মে মাসে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেলেও রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি থেকে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের পর ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে থেকে তার প্রস্থান ছিল মূলত রাজকীয় জীবন থেকে একপ্রকার নির্বাসনের প্রতীক।
বাকিংহাম প্যালেস ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
প্রিন্স অ্যান্ড্রুর গ্রেফতারের খবরে বাকিংহাম প্যালেস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে এই ঘটনা রাজা চার্লসের রাজকীয় ভাবমূর্তির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যখন রাজপরিবার সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের Criminal Investigation ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই সংবাদটি ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে। টেমস ভ্যালি পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে অ্যান্ড্রুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি গোপন স্থানে রাখা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তাকে আদালতে সোপর্দ করা হতে পারে। তার বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজপরিবারের এই সদস্যের সামনে দীর্ঘ কারাবাসের সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ
পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, এই মামলার তদন্তে আরও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং সরকারি পদের প্রভাব খাটিয়ে কোনো আর্থিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এই আইনি লড়াইয়ে অ্যান্ড্রু তার ডিফেন্স টিম হিসেবে প্রথিতযশা আইনজীবীদের নিয়োগ দিলেও পুলিশের হাতে থাকা তথ্যপ্রমাণ তার জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।