বিশ্বের আকাশে রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয়েছে এক আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণ। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনে রোজা ফরজ করার যে বিধান দেওয়া হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে 'তাকওয়া' বা পরহেজগারিতা সৃষ্টি করা। তবে এই উপবাসের সংস্কৃতি কেবল ইসলামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ইহুদি ধর্মে ইয়োম কিপুর, খ্রিস্টধর্মে লেন্ট এবং হিন্দুধর্মে একাদশী ব্রতের মতো আচারগুলো প্রমাণ করে যে, মানব ইতিহাসে আধ্যাত্মিক শুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা চিরকালই ছিল।
ক্ষুধার্তের বেদনা ও সামাজিক ন্যায়বিচার রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, বরং ক্ষুধার মাধ্যমে আত্মাকে জাগিয়ে তোলা। একজন সচ্ছল ব্যক্তি যখন সারাদিন অভুক্ত থাকেন, তখন তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের প্রকৃত কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় সামাজিক ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা। নিজের বিলাসী ব্যয় কমিয়ে যদি একজন দরিদ্রের ইফতার নিশ্চিত করা যায়, তবেই সিয়াম সাধনা পূর্ণতা পায়।
ঐশী বার্তার ধারাবাহিকতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবী ও রাসূলের মাধ্যমে ঐশী দিকনির্দেশনা এসেছে। তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল এবং কোরআন—সবগুলোই একত্ববাদ, ন্যায়বিচার এবং দানশীলতার শিক্ষা দেয়। যদিও ভাষা, সংস্কৃতি বা ভূগোলের কারণে ধর্মীয় আচারে ভিন্নতা দেখা যায়, কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায় মানুষের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা একই। মানুষের তৈরি করা ধর্মীয় বিভাজন ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে আধ্যাত্মিক সত্যের অনুসন্ধানই বর্তমান সময়ের দাবি।
প্রযুক্তি ও নৈতিকতার সংকট বর্তমান বিশ্ব এক কঠিন নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটলেও মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শান্তি কমেছে। এই বাস্তবতায় রমজান হতে পারে একটি নৈতিক পুনর্জাগরণের সুযোগ। ঘৃণা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকাই হলো রোজার প্রকৃত সামাজিক প্রয়োগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করা, দুর্নীতি থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিবেশীর প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করাও রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একটি মানবিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাংলাদেশে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও রমজানের শিক্ষা আমাদের একই মাটির সন্তান হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ দেয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ানো এবং অন্যের কষ্ট বোঝার মানসিকতা তৈরি হলে দেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, নৈতিক শক্তিতেও সমৃদ্ধ হবে। রমজান হোক আমাদের আত্মশুদ্ধি এবং একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার নতুন অঙ্গীকারের সূচনা।