ব্রিটিশ মিউজিয়াম সম্প্রতি ইসরায়েলপন্থী সংগঠন ‘ইউকে লইয়ার্স ফর ইসরায়েল’ (ইউকেএলএফআই)-এর চাপের মুখে তাদের প্রদর্শিত কিছু নিদর্শনের লেবেল থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ এবং পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিটিশ মিউজিয়াম ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ মিউজিয়াম একটি সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান। এর বিশাল সংগ্রহ মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত বা লুট করা নিদর্শন নিয়ে গড়ে উঠেছে। যে সাম্রাজ্যবাদী চেতনা থেকে এই জাদুঘর সৃষ্টি হয়েছিল, আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পেছনেও সেই একই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভূমিকা ছিল। জাতিসংঘসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলকে একটি ঔপনিবেশিক দখলদার রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ইতিহাস পুনর্লিখন ও ইসরায়েলের বৈধতা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ সব সময়ই নিজেদের দখলদারত্বকে বৈধতা দিতে ইতিহাসকে পুনর্লিখন করার চেষ্টা করেছে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সত্তা নিজেকে চিরকালীন অস্তিত্বশীল হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়। ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দবন্ধটি নথি থেকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো—ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং তাদের জনগণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। এটি মূলত ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়েরই একটি অংশ।
জায়নবাদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহের যোগসূত্র জায়নবাদের গোড়ার দিকের ইতিহাসের সঙ্গে প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহের গভীর সম্পর্ক ছিল। ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন ফিলিস্তিন আক্রমণ করেন, তখন তার সাথে ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষাবিদ ছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৯৯ সালে জায়নবাদীরা ‘ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপন’ করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়। বর্তমানে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ভেতরে প্রাচীন স্থাপনাগুলো ধ্বংস ও দখল করার মাধ্যমে তাদের ইতিহাস মুছে ফেলার একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
উপনিবেশমুক্ত করার আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে ‘ডিকলোনাইজ দ্য কারিকুলাম’ বা পাঠ্যক্রমকে উপনিবেশমুক্ত করার যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের উপনিবেশমুক্ত দেখানোর কথা বললেও বাস্তবে তারা ইসরায়েলি চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। গ্যালারির লেবেল থেকে ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দটি সরানো কোনো ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের জন্য নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক এজেন্ডার বাস্তবায়ন। কারণ এই অঞ্চলের জন্য ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নাম হলো ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন।