বাংলাদেশে করব্যবস্থা প্রগতিশীল করনীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে বেসরকারি চাকুরিজীবীরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা ও মর্যাদা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি খাতের চাকুরিজীবীদের মধ্যে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য কর ব্যবস্থায় গভীর বৈষম্য তৈরি করেছে।
বিদ্যমান কর কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও সংকট
১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের নতুন আয়কর আইন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে করমুক্ত ব্যয়ের সীমা পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে গত এক দশকে মুদ্রাস্ফীতি, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, কর কাঠামোর পরিবর্তন তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটেও করছাড়ের সীমা নামমাত্র বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হলেও শর্তগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা সাধারণ করদাতাদের ওপর করের বোঝা আরও বাড়িয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈষম্য
সরকারি কর্মচারীরা বাসভবন, যানবাহন এবং বিভিন্ন ভাতা করমুক্তভাবে ভোগ করলেও বেসরকারি চাকুরিজীবীদের এই সব সুবিধা ব্যক্তিগত আয়ের ওপর কর দিয়ে মেটাতে হয়। একই বাজারে বসবাস করে এই ধরনের নীতিগত বৈষম্য বেসরকারি পেশাজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। এছাড়া, বেসরকারি খাতে নিয়মিত উৎস কর (TDS) কর্তন হওয়ায় কর ফাঁকির সুযোগ নেই, অথচ কর নেটের বাইরের বিশাল অংশ এখনো আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আসন্ন বাজেটের জন্য প্রস্তাবিত সংস্কার
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করদাতাদের স্বস্তি দিতে কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রয়োজন:
- করমুক্ত আয়সীমা: সর্বনিম্ন করমুক্ত আয়ের সীমা ৬,০০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা।
- কর হার হ্রাস: ব্যক্তিপর্যায়ে সর্বোচ্চ কর হার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা।
- ব্যয় অনুমোদন: বাড়িভাড়া বাবদ ৪.৮ লাখ, চিকিৎসায় ৩ লাখ এবং যাতায়াত খাতে ১.২ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ব্যয় অনুমোদন করা।
- সামাজিক সুরক্ষা: করদাতাদের প্রদেয় করের একটি অংশ (১০%) সরকারি পেনশন স্কিমে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া, যা ৬০ বছর বয়সের পর মাসিক পেনশন হিসেবে ফেরত পাবেন।
- শিক্ষা ও নির্ভরশীলতা: সন্তানদের শিক্ষা ও পিতা-মাতার ভরণপোষণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ করছাড়ের সুবিধা প্রদান।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা
এই সংস্কারগুলো কার্যকর করা হলে করদাতার সংখ্যা এবং কর জালের পরিধি বাড়বে। মানুষ যখন নিজেকে রাষ্ট্রের ‘অধিকারপ্রাপ্ত অংশীদার’ মনে করবে, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হবে। মেধা পাচার রোধ এবং দক্ষ মানবসম্পদকে দেশে ধরে রাখতে হলে এই বৈষম্যমূলক কর কাঠামো ভেঙে একটি মানবিক ও ন্যায়সংগত সংস্কার জরুরি। কর প্রদান যেন ভীতির কারণ না হয়ে নাগরিক গর্বের বিষয়ে পরিণত হয়, রাষ্ট্রকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।