সুইডেন বা ইউরোপের দেশগুলোর জীবনব্যবস্থা ও সামাজিক পরিকাঠামো যে বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের সমাজে প্রয়োগ করা সব সময় সহজ বা প্রাসঙ্গিক নয়। তবে শিক্ষা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে যদি আমাদের বিশ্বমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হয়, তবে সেই পরিবর্তনের সূচনা এখনই প্রয়োজন।
ইউরোপের শিক্ষা দর্শন ও ভর্তি পরীক্ষার অনুপস্থিতি সুইডেন ও ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশে প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ভর্তির জন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রচলন নেই। সাধারণত শিশুর বয়স, বসবাসের এলাকা এবং অভিভাবকের পছন্দের ভিত্তিতে স্কুল নির্ধারিত হয়। ইউরোপের শিক্ষা দর্শন মূলত প্রতিটি শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক চাপ কমিয়ে শেখার স্বাভাবিক ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
মানবিক গুণাবলি ও ব্যক্তিত্ব গঠন ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের কোনো ধরাবাঁধা সিলেবাসের বদলে সামাজিক মূল্যবোধ, একতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া হয়। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে জীবনের পরিকাঠামো তৈরিতে যা যা দরকার তার সবটুকু তারা পায়। ফলে জীবনে চলার পথে তারা দ্বন্দ্ব নয়, বরং ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শেখে।
সমন্বিত শিক্ষা কাঠামো ও গ্রেডিং পদ্ধতি সুইডিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় গ্রেডিং পদ্ধতিটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির আগে শিশুদের কোনো গ্রেড দেওয়া হয় না। প্রাথমিক শিক্ষার তিনটি স্তরে শিশুদের ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান এবং কারুকলার মতো ১৬টি বাধ্যতামূলক বিষয় পড়তে হয়। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষার যে কোনো একটি বেছে নিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও শিক্ষকদের সক্ষমতা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এখন ডিজিটালাইজেশনের হাওয়া লাগলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়ে গেছে। লেখকের মতে, শ্রেণিকক্ষে যুগোপযোগী শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ জরুরি। শুধু সনদপত্রসর্বস্ব বা মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষা পদ্ধতি দিয়ে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবনা সুশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিকল্প নেই। যেখানে শিশুশিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষকদের পেশাগত জ্ঞান ও নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের একটি মিলনকেন্দ্র, যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরাসরি বৈশ্বিক চাহিদার সাথে যুক্ত করবে।
উপসংহার: পরিবর্তনের ডাক জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও মনিটরিং ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র এবং সুশিক্ষিত কারিগররাই পারেন একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?