জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর জোরালো দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)। শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর উত্তরার ফ্রেন্ডস ক্লাব মাঠে আয়োজিত ঢাকা বিভাগীয় ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভায় দলটির শীর্ষ নেতারা ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং বিচারিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিচারব্যবস্থার সংস্কার ও কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী ‘অপজিশন’ বা বিরোধী শক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “দেশে নারী নিপীড়ন ও শিশু ধর্ষণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এসব অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় এখনো দীর্ঘসূত্রতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা বিদ্যমান। এনসিপি বিচারব্যবস্থার এই স্থবিরতা ভাঙতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে রাজপথে কঠোর অবস্থান নেবে।”
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “রাষ্ট্রপতি কেবল স্লোগান পরিবর্তন করছেন, কিন্তু দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এমনকি কোনো আলোচনা ছাড়াই ‘চিফ প্রসিকিউটর’ (Chief Prosecutor) পরিবর্তন করা হয়েছে। সরকারের প্রতিটি বিতর্কিত পদক্ষেপ এনসিপি নিবিড়ভাবে ‘মনিটর’ (Monitor) করছে এবং জনস্বার্থে এসবের প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে।”
তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তার ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে (Local Government Election) সামনে রেখে এনসিপি তাদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছে। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জেলা প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে (Grassroots Level) বিস্তৃত করতে হবে। স্থানীয় নির্বাচনে আমাদের আরও শক্তিশালী জনসমর্থন প্রয়োজন। আমরা কেবল রাজপথের শক্তি নই, বরং একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চাই।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কড়া বার্তা ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পরিষ্কার বার্তা দিতে চাই—ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিন। যারা সরকারের ‘ড্রাইভিং সিটে’ (Driving Seat) বসেছেন, তারা যেন উশৃঙ্খলভাবে গাড়ি না চালান। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে।”
এ সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন যে, বিএনপি বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘জুলাই সনদ’ (July Proclamation) অনুযায়ী বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের অন্যান্য ‘জুডিশিয়াল’ ও ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ’ সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে, অন্যথায় জনরোষ এড়ানো সম্ভব হবে না।
ঐক্য ও সম্প্রীতির রাজনীতি
বিগত জুলাই আন্দোলনে রাজপথে যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা আগামী দিনেও অটুট রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, এনসিপি কোনো বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, বরং জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সব দেশপ্রেমিক শক্তিকে নিয়ে একযোগে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একমত হন যে, দ্রুত বিচারিক সংস্কার ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না করলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (Interim Government) স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।