মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র হয়েছে জ্বালানি সংকট। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর। উদ্ভূত ‘এনার্জি ক্রাইসিস’ (Energy Crisis) মোকাবিলা এবং সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নজিরবিহীন একগুচ্ছ ‘অস্টেরিটি মেজারস’ (Austerity Measures) বা কঠোর সাশ্রয়ী পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী ১৬ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের সব স্কুল দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন: অনলাইন ক্লাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সোমবার (৯ মার্চ) জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এই জরুরি কৃচ্ছ্রসাধন নীতির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, স্কুলগুলো সশরীরে বন্ধ থাকলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগামী ১৬ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাঠদান চলবে সরাসরি ‘অনলাইন ক্লাস’ (Online Class)-এর মাধ্যমে। মূলত যাতায়াত ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয় করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।
অফিসসূচিতে বদল ও ‘হোম অফিস’ প্রবর্তন জ্বালানি খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সরকারি দপ্তরগুলোতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগামী দুই মাস সরকারি কর্মকর্তাদের জ্বালানি ভাতা (Fuel Allowance) ৫০ শতাংশ কমানো হবে। পাশাপাশি সরকারি যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বাস ও অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি পরিষেবা ছাড়া অন্য সরকারি যানের ৬০ শতাংশ সাময়িকভাবে চলাচল বন্ধ থাকবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে সরকারি অফিস সপ্তাহে মাত্র চার দিন খোলা থাকবে। প্রয়োজনীয় সেবা ছাড়া দপ্তরগুলোতে মাত্র ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী সশরীরে উপস্থিত থেকে কাজ করবেন। বাকি অর্ধেক কর্মীবাহিনী ‘হোম অফিস’ (Home Office) বা ঘরে বসে কাজ করবেন।
বিলাসবহুল ব্যয় ও বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নিয়মিত খরচ ২০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া নতুন গাড়ি কেনা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (AC) এবং আসবাবপত্র কেনার ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে ইসলামাবাদ। শেহবাজ শরিফ বলেন, “দেশকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সরকার এমন কঠিন ও অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।”
উত্তেজনার কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালী ও তেলের আকাশছোঁয়া দাম ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ‘গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন’ (Global Supply Chain) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয় পাকিস্তানও। গত সপ্তাহেই দেশটিতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ৫৫ রুপি বাড়ানো হয়েছে, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে একবারে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপগুলো কেবল জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা করার একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক মুভ’ (Strategic Move)। তবে দুই সপ্তাহ স্কুল বন্ধ এবং অনলাইন ক্লাসের এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।