এ অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণয়ন করা গণভোট অধ্যাদেশসহ ১৩৩ অধ্যাদেশ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ অন্যতম।
এদিকে গণভোট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে উচ্চ আদালত রুল দিয়েছেন।
এরপর জামায়তে ইসলামী বলছে, রুল জারি হলেও সংসদে এসব বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। আর রিটকারী আইনজীবী বলছেন, বিষয়টি এখন বিচারাধীন। তবে বিএনপি বলছে, সংবিধান অনুসারে অধ্যাদেশগুলো আলোচনার জন্য সংসদে প্রথম অধিবেশনে পেশ করা হবে। তারপর আলোচনার মধ্য দিয়ে কিছু ল্যাপস হতে পারে, কিছু পাস হতে পারে, আবার কিছু সংশোধন হতে পারে। ১৩৩ অধ্যাদেশ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবসান ঘটে। এই সরকারের প্রায় ১৮ মাস মেয়াদে যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছে, তার মধ্যে একটি হলো, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ। যেই সংশোধনীর মাধ্যমে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় চব্বিশের আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডসহ বিগত সময়ের গুম সংক্রান্ত বিচারকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি একাধিকবার সংশোধন হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব সংশোধনের ওপর ভিত্তি করে একাধিক মামলার রায়ও হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতে বিচারকের শূন্যতা পূরণে ‘সুপ্রিম কোর্ট জাজেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি সংসদে গৃহীত হওয়ার আগেই এই আইনে উচ্চ আদালতে অনেক বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে।
সরকারের ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৪ সালে মোট ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।
এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ৯২টির মাধ্যমে পূর্ববর্তী আইন সংশোধন করা হয়। একই আইনে একাধিকবার সংশোধনী আনতে একাধিক অধ্যাদেশের নজিরও আছে। যেমন—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে একাধিকবার সংশোধনী এনে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে সংশোধনী সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আইন রহিত করতে জারি করা হয়েছে তিনটি অধ্যাদেশ। আর নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে জারি করা হয়েছে ৩৮টি অধ্যাদেশ। যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় রয়েছে। সংবিধানে যা বলা হয়েছে সংসদের অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে এই অধ্যাদেশে জারির ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস হতে হবে। না হয় অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে লোপ পাবে অধ্যাদেশের কার্যকারিতা।
এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৯৩। (১) [সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।
তবে রাষ্ট্রপতির এই অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা অবারিত নয়। এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোনো অধ্যাদেশে এমন কোনো বিধান করা হইবে না, (ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না; (খ) যাহাতে এই সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়; অথবা (গ) যাহার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোন অধ্যাদেশের যে কোন বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়।
অধ্যাদেশ সংসদে গৃহীত হওয়ার বিধান সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (২) এই অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পাইবে। (৩) সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থার কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট ব্যবস্থা-গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি এমন অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন, যাহাতে সংবিধান-দ্বারা সংযুক্ত তহবিলের ওপর কোন ব্যয় দায়যুক্ত হউক বা না হউক, উক্ত তহবিল হইতে সেইরূপ ব্যয়নির্বাহের কর্তৃত্ব প্রদান করা যাইবে এবং অনুরূপভাবে প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার সময় হইতে তাহা সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে। (৪) এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জারীকৃত প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হইবার তারিখ হইতে ত্রিশ দিনের মধ্যে এই সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হইবে।
সরকার যা বলছে ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সেই অধিবেশনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবিধানিকভাবে যতগুলো অধ্যাদেশ হয়েছে, প্রত্যেকটা অধ্যাদেশই আমরা বিল আকারে পেশ করবো। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা ১৩৩ অধ্যাদেশের প্রত্যেকটিই পেশ করা হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৩৩টি অধ্যাদশে প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাংবিধানিকভাবে আমরা এসব উপস্থাপন করতে বাধ্য। কিন্তু সেই ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনটা কিভাবে গৃহীত হবে তা সংসদের এখতিয়ার। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন, ওর বাইরে আরও একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। সেই আদেশটার নাম হল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ। ইহা মাস্কুলিন না ফ্যামিনিন নাকি কমন জেন্ডার আমি জানি না। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে আদেশ জারির এখতিয়ার ছিল। যার ভিত্তি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর সেশনে বসা এবং মুলতবির পর অর্ডিন্যান্স জারির ক্ষমতা পেল রাষ্ট্রপতি। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর অর্ডারের জামানা শেষ। এখন কিভাবে রাষ্ট্রপতি অর্ডার জারি করলেন? আমরা তখন প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমরা এই সমস্ত আরোপিত জবরদস্তি কোন আদেশের বলে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের কোন ক্ষমতা খর্ব হতে দেব না। কারণ জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন সেটা সংবিধানিক নির্বাচন।