একটু দূরে ঘরের বারান্দায় চোখ বন্ধ করে পড়ে আছেন দুই মেয়ের বাবা ও মা। তাদের পাশে বসে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে একমাত্র ছেলে শিশু ইসমাইল। কারও মুখে কথা নেই। হা-হুতাশ বা আহাজারিও নেই। শোকে বাকরুদ্ধ সবাই।
শুক্রবার সকাল ৭টায় খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে গিয়ে এমন অবস্থা দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের মোংলায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪ জনের মধ্যে চার জনের বাড়ি ওই গ্রামে। তাদের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পর সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। একদিন আগে যে বাড়ি ছিল বিয়ের উৎসবে মুখর, সেই বাড়ি এখন শোকে স্তব্ধ। একই সঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতেই পারছেন না।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, বুধবার রাতে গ্রামের আব্দুস সালাম মোড়লের মেয়ে মিতু আকতারের সঙ্গে মোংলার সাব্বির হোসেনের বিয়ে হয়। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা হয় দুই পরিবারের ১৬ সদস্য। এর মধ্যে ছিলেন কনেসহ তার ছোট বোন লামিয়া (৮), দাদি রাশিদা খাতুন (৫৫) ও নানি আনোয়ারা খাতুন (৫৭)। বুধবার বেলা সোয়া ৪টার দিকে বাড়িতে ফোন আসে বিয়ের গাড়িটি সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছে। গাড়ির যাত্রীর সকলেরই অবস্থা গুরুত্বর। খবর শুনেই বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সহযোগিতায় তাৎক্ষণিক আরেকটি গাড়িতে করে পরিবারের সদস্যরা রওনা হন। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই জানতে পারেন কেউ আর বেঁচে নেই। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চারজনের লাশ নিয়ে ফিরে আসেন তারা।
কনে মিতু আকতারের খালা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার বোনের তিন ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ে মিতু আকতার, মেজো লামিয়া ও সবার ছোট ইসমাইল। বোনের সঙ্গে তার নতুন শশুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য ছোট ভাই ইসমাইলও বায়না ধরেছিল সেদিন। কিন্তু গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় যেতে পারেনি।
‘আল্লাহ কেবল আমাকেই বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমার মা, বোনের দুই মেয়ে, বোনের শাশুড়ি সবাই কি আনন্দ করতি করতি গেল। আর এখন তাগের লাশ দেখতি হচ্ছে। আল্লাহ আমাগের কি পরীক্ষায় ফেললো।’ বলছিলেন তিনি।
প্রতিবেশী মফেজ মোড়ল বলেন, আব্দুস সালামের বাবা বেঁচে নেই। মা, স্ত্রী ও তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। ছোট-খাটো ব্যবসা করে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে ছিলেন পরিবারে। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য এক বছর আগে নতুন বাড়ি করেছেন। বাড়ির কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে এক সপ্তাহ আগে থেকেই সাজসজ্জা করেছিলেন বাড়িটি। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের হৈ-হট্টগোলে বাড়িটি মুখর ছিল গত কয়েকদিন ধরে। বৃহস্পতিবার মেয়েকে শশুর বাড়ি পাঠিয়ে শুক্রবার জামাই-মেয়েকে নিজ বাড়িতে আনার কথা ছিল। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল।
স্থানীয় ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, একই সঙ্গে দুই মেয়েসহ পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারটি। লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পর থেকে কোনো কথা বলছেন না তারা। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক ও উৎসুক মানুষ বাড়িটিতে ভিড় করছেন। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
তিনি জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় জানাজা শেষে দুই মেয়ে ও তার দাদিকে একই কবর স্থানে দাফন করা হয়েছে। আর নানির লাশ তার নিজ বাড়ি দাকোপের তিলডাঙ্গা গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।