’ এই আক্ষেপ নিয়ে এমনটাই বলছিলেন আনন্দলোক প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী আসিফ গালিব সোহান। শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে কিছুটা ব্যস্ত বইমেলায় তিনি নিরবে বসে ছিলেন প্রকাশনীর স্টলে। মেলায় যৎসামান্য যে কৌতূহলী পাঠকের উপস্থিতি ছিল, তা আনন্দলোকের সেই কোণার স্টলে পৌঁছায়নি।
প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলার শেষ সপ্তাহে পাঠকের ভিড়ে হাঁটতেই বেগ পেতে হতো।
উৎসাহী দর্শক ও পাঠকের সঙ্গে লেখকদের উপস্থিতিতে মেলা কোলাহলময় হয়ে উঠত। ছুটির দিনে তো তিল ধারণেরও জায়গা থাকত না। কিন্তু এবারের বইমেলায় সোহানের মতো ছোট-বড় অনেক স্টলের বিক্রয়কর্মীদেরই দীর্ঘ অলস সময় কাটাতে হয়েছে। স্টলে বসে তারা অপেক্ষা করেছেন পাঠকের জন্য, কিন্তু প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যায়নি।
দু-একজন পাঠক সামনে এসে দাঁড়ালেও বেশিরভাগই শুধু বইয়ের দাম জিজ্ঞেস করে চলে গেছেন, কিনেছেন খুব কমই। ফলে দিন শেষে বিক্রয়কর্মীদের কণ্ঠে শোনা গেছে স্পষ্ট হতাশা। পহেলা ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরুর রীতি থাকলেও এবার জাতীয় নির্বাচনের কারণে তা পিছিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি শুরুর কথা ছিল। কিন্তু রোজা শুরু হয়ে যাওয়ায় ‘পাঠকশূন্যতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির শঙ্কা’ জানিয়ে মেলা আয়োজনের বিষয়ে আপত্তি জানান প্রকাশকরা। পরে দফায় দফায় বৈঠক, মেলার স্টল ভাড়া মওকুফসহ প্রকাশকদের অন্যান্য দাবি মেনে নিয়ে রোজার মধ্যেই শুরু হয় বইমেলা।
মেলায় পাঠক উপস্থিতির কমতি ও বিক্রির খরার মতো একাধিক বিষয় বিবেচনায় নতুন বই আনেননি অধিকাংশ প্রকাশনী। পূর্বে প্রকাশিত বই নতুন মলাটে বইমেলায় এনেছেন তারা।
গত এক সপ্তাহের পাঠক উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কম। বই উল্টেপাল্টে দেখার প্রবণতাও কম। অনেকেই ঈদের বাজার শেষে একটু ঘুরে দেখতে বইমেলায় এসেছেন। ঈদকেন্দ্রিক অন্যান্য কেনাকাটায় বই কেনার প্রবণতা কম লক্ষ্য করা গেছে।
এর প্রভাব পড়েছে ছোট-বড় সব প্রকাশনীর ওপর। তবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন ছোট প্রকাশনীগুলো, যারা মেলাকেন্দ্রিক নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পান।
কথা হয়েছে ইলহাম প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী আলী আজগরের সঙ্গে। তিনি মেলার শুরু থেকেই এখানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। মেলার শুরু থেকে ১৭ দিনে তিনি প্রায় ৫০টি বই বিক্রি করেছেন, গড়ে প্রতিদিন তিনটি করে। বিক্রির অবস্থা ‘খুব খারাপ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিলেকোঠা প্রকাশনীতে নিশ্চুপ বসে ছিলেন তাজিন আহমেদ তামান্না। তিনি বাংলানিউজকে জানান, এবারের মেলায় একাধিক দিন তাদের এভাবে বসে থাকতে হয়েছে। পুরো ৬-৭ ঘণ্টায় তারা কোনো বই বিক্রি করতে পারেননি।
তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি তিন ভাগের এক ভাগেরও কম। মানুষ শপিং করে মেলায় আসে। অন্যান্য বছর মেলার সময় আর কোনো কেনাকাটা থাকে না। কিন্তু এবার মানুষ অন্যত্র টাকা খরচ করছে। এবারের বিক্রি থেকে স্টলের ডেকোরেশন ও ডিজাইনের খরচ উঠবে কি না, তা নিয়েই শঙ্কা রয়েছে।
এ বছর তাদের মেলাকেন্দ্রিক কোনো নতুন বই নেই। আগামীতে যেন স্টল বরাদ্দ পেতে সমস্যা না হয়, সে কারণেই এবার স্টল নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বইমেলায় দেখা গেল বায়ান্ন প্রকাশনীকেও। একসময় এই প্রকাশনী থেকে মারজুক রাসেলের কবিতার বই ‘দেহবণ্টন বিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর’ ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এ ছাড়াও ওবায়েদ হকের জলেশ্বরী, মুহাম্মদ নিজামসহ একাধিক তরুণ লেখকের বই প্রকাশ করে সাড়া ফেলেছিল প্রকাশনীটি। কিন্তু এবার প্রকাশক আসিফকে দেখা গেল অলস হয়ে বসে থাকতে।
তিনি জানান, আমরা পুরোনো বই নিয়েই জোড়াতালি দিয়ে টিকে আছি। বড় দোকানগুলোতেই বিক্রি নেই। মানুষ নেই। আমাদের আর কী বিক্রি! গত বছরের ছয় ভাগের এক ভাগ বিক্রিও হয়নি।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আমজাদ হোসেন খান কাজল বলেন, বেচাকেনা অনেক খারাপ। ঈদের কারণে মানুষ বই কিনছে না।
তবে কিছু প্রকাশনীতে পাঠকের ভিড় দেখা গেছে। আজ মেলায় এসেছিলেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। এছাড়াও দেখা গেছে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনকে। দুজনই বসেছিলেন অন্যপ্রকাশের স্টলে।
জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর প্রকাশক আব্দুল ওয়াসি তফাদার বাংলানিউজকে জানান, তার বিক্রি অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। তবে যেভাবে বিক্রি কম হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন, সেরকম খারাপ হয়নি। গত সপ্তাহে বিক্রি কিছুটা ভালো হওয়ায় তিনি স্বস্তিতে আছেন।
মেলায় বিক্রির পাশাপাশি পাঠকদের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি লক্ষ্যও থাকে। এবছর সে লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।