বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে মাঝে মাঝেই এমন কিছু প্রতিভা উঠে আসে, যা পুরো দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দেয়। গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের ফেসবুক ও ইউটিউব পাড়ায় এমনই এক বিস্ময়কর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আকাশছোঁয়া স্বপ্নের সমান উচ্চতার একটি রকেট বা মিসাইল তৈরি করেছেন এক তরুণ। এই উদ্ভাবকের নাম মীর মোহাম্মদ ফারাবি হাসান পায়েল। সাইক ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (Mechanical Engineering) এই ছাত্রের উদ্ভাবন এখন নেট দুনিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
মিসাইল না কি রকেট? যা বলছেন পায়েল
সোশ্যাল মিডিয়ায় পায়েলকে নিয়ে তৈরি হওয়া ‘মিসাইল’ গুঞ্জন নিয়ে এই তরুণ স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। তিনি জানান, তার তৈরি এই বিশেষ বস্তুটি আসলে একটি ‘আনগাইডেড রকেট’ (Unguided Rocket)। এটি মূলত পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে ফ্লাইটের ভারসাম্য বা স্ট্যাবিলিটি (Stability) এবং বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা সংক্রান্ত ‘Real-time Data’ সংগ্রহের জন্য।
পায়েরেল দাবি, এটি কেবল একটি প্রোটোটাইপ। তবে প্রয়োজনীয় প্রাযুক্তিক এবং লজিস্টিক (Logistics) সহায়তা পেলে এই রকেটকেই শক্তিশালী গাইডেড মিসাইলে রূপান্তর করা সম্ভব। মাত্র ছয় থেকে সাত হাজার টাকা খরচে তৈরি এই রকেটটি এরই মধ্যে ১,৫০০ মিটার বা ১.৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। পায়েলের মতে, উন্নত মানের কেমিক্যাল এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রপেলেন্ট (Propellant) ব্যবহার করলে এর রেঞ্জ (Range) অনায়াসেই ২০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাবে।
শূন্য থেকে শুরু: গবেষণার অর্থ সংস্থানে অনন্য কৌশল
পায়েলের প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি কোনো হঠাৎ ঘটা ঘটনা নয়। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি প্রোগ্রামিং (Programming) আয়ত্ত করতে শুরু করেন। ২০২০ সাল থেকে রোবটিক্স (Robotics) নিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। তবে ব্যক্তিগত গবেষণার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করা ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
এই প্রতিবন্ধকতা কাটাতে পায়েল এক অভিনব পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইদের ‘Final Year Project’ তৈরি করে দেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই চলে তার গবেষণাগারের খরচ। এই পুরো যাত্রায় তার পরিবার এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে সব সময় অনুপ্রেরণা ও সমর্থন দিয়ে আসছে।
ড্রোনের মাধ্যমে আধুনিক কৃষিকাজ ও সামরিক নজরদারি
পায়েলের উদ্ভাবনী ঝুলি কেবল রকেটেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এরই মধ্যে একটি ‘Robotic Hand’ তৈরি করেছেন যা বাণিজ্যিকভাবে বাজারে লঞ্চ করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ড্রোন প্রযুক্তি (Drone Technology)। তিনি ‘Agriculture Drone’ নিয়ে কাজ করছেন যা ফসলের রোগ নির্ণয় ও কীটনাশক ছিটানোয় বিপ্লব আনতে পারে। পাশাপাশি ‘Military Surveillance’ বা সামরিক ব্যবহারের জন্য তিনি তৈরি করছেন বিশেষ ‘Combat Drone’। পায়েলের মতে, বাংলাদেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অপরাধ দমন এবং সীমান্তে নজরদারিতে এই ড্রোনগুলো হতে পারে গেম-চেঞ্জার।
নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন: প্রয়োজন সরকারি সহায়তা
অনেকেই পায়েলের তৈরি রকেট নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই প্রসঙ্গে পায়েল অভয় দিয়ে জানান, তার রকেটে কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা ‘Warhead’ নেই। ফলে এটি লক্ষ্যচ্যুত হলেও বিস্ফোরণের কোনো ঝুঁকি নেই।
পায়েলের দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন হলো বাংলাদেশে একটি ‘Tech Industry’ বা ‘Sky Robotic Lab’ গড়ে তোলা। যেখানে ড্রোন এবং বিভিন্ন হাই-টেক যন্ত্রপাতি দেশীয় প্রযুক্তিতেই উৎপাদিত হবে। তবে ‘Legal Hurdles’ বা আইনি জটিলতা এবং কাঁচামাল সংগ্রহের সীমাবদ্ধতাকে তিনি বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। রকেট উৎক্ষেপণের অনুমতি এবং উন্নত মানের কেমিক্যাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সহযোগিতা পেলে পায়েল মনে করেন, বাংলাদেশও একদিন নিজস্ব শক্তিশালী ‘Defense System’ গড়ে তুলতে পারবে।