ভারতের লাদাখের প্রখ্যাত অধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুক দীর্ঘ ছয় মাস পর কারামুক্ত হয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে লাদাখের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া এই কর্মীকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। শনিবার (১৪ মার্চ) পশ্চিম ভারতের জোধপুর শহরের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্ত হন।
জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও সরকারের ইউ-টার্ন
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে আরোপিত ‘National Security Act’ (NSA) বা জাতীয় নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী আটকের সিদ্ধান্তটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘Review’ বা পর্যালোচনার পর অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হলো। লেহ এপেক্স বডির আইনজীবী মুস্তফা হাজি সংবাদ সংস্থা ‘AFP’-কে নিশ্চিত করেছেন যে, আদালতের নির্দেশে জোধপুর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি এখন মুক্ত পরিবেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন।
আন্দোলন ও গ্রেপ্তারের নেপথ্যে
৫৯ বছর বয়সী সোনম ওয়াংচুক লাদাখের হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা এবং এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই করছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে লাদাখে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের সময় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ৪ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। নয়াদিল্লির অভিযোগ ছিল, ওয়াংচুকের ‘Provocative Speech’ বা উত্তেজক ভাষণই ওই সহিংসতার মূল ইন্ধন।
গ্রেপ্তারের সময় তিনি লাদাখের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সুরক্ষা এবং জমি রক্ষার দাবিতে অনশন পালন করছিলেন। ভারতের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই কাউকে ১২ মাস পর্যন্ত আটকে রাখার বিধান থাকলেও সরকার ছয় মাস পর তার ওপর থেকে এই বাধ্যবাধকতা সরিয়ে নিল।
বাস্তব জীবনের ফুংসুখ ওয়াংড়ু
পেশায় প্রকৌশলী সোনম ওয়াংচুক কেবল একজন অধিকারকর্মীই নন, তিনি একজন দূরদর্শী উদ্ভাবকও। হিমালয়ের ঊষর অঞ্চলে পানি সংরক্ষণের জন্য তার তৈরি ‘Ice Stupa’ বা বরফের স্তূপ প্রকল্প বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০১৮ সালে সমাজসেবা ও শিক্ষার সংস্কারের জন্য তাকে এশিয়ার নোবেল খ্যাত ‘Ramon Magsaysay Award’ প্রদান করা হয়। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত বলিউড সুপারস্টার আমির খান অভিনীত ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘3 Idiots’-এর জন্য। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ফুংসুখ ওয়াংড়ু’ মূলত সোনম ওয়াংচুকের জীবন ও কাজের অনুপ্রেরণাতেই তৈরি করা হয়েছিল।
সংলাপ ও স্থিতিশীলতার পথে সরকার
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লাদাখ অঞ্চলে ‘Peace and Stability’ বা শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সব পক্ষের সঙ্গে ‘Meaningful Dialogue’ বা অর্থবহ সংলাপে বসতে চায় কেন্দ্র। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ এবং লাদাখের ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষ প্রশমিত করতেই ওয়াংচুককে মুক্তি দেওয়ার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার।
মুক্তি পেলেও ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে থাকা মূল মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি পুনরায় লাদাখের অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।