বাংলার ঐতিহ্যের ধারক ও দেশের বৃহত্তম ঈদুল ফিতরের জামাতের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। এবার এই প্রাচীন ময়দানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল ফিতরের বড় জামাত। প্রতি বছরের মতো এবারও লাখো মুসল্লির পদচারণায় মুখরিত হবে নরসুন্দার তীর। ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এই বিশাল জমায়েতকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে নিশ্ছিদ্র ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
নামাজের সময়সূচি ও ইমামতি ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। এবারের জামাতে ইমামতি করবেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুফতি আবুল খায়ের মো. ছাইফুল্লাহ। বড় জামাতে নামাজ পড়লে সওয়াব বেশি পাওয়া যায়—এমন অটল বিশ্বাস থেকে প্রতি বছরই এখানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা ছুটে আসেন।
নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য প্রাচীর: ৪ স্তরের সুরক্ষা বলয় দেশের বৃহত্তম এই জমায়েতকে কেন্দ্র করে আধুনিক প্রযুক্তি ও চৌকস বাহিনীর সমন্বয়ে এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছক (Security Blueprint) তৈরি করা হয়েছে। চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে মোতায়েন থাকবে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আনসার। এছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকছে ৫ প্লাটুন বিজিবি।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা (CCTV Camera), ৭টি অত্যাধুনিক ড্রোন (Drone) এবং ৭টি লাইভ ক্যামেরা। মাঠের চারপাশ নজরদারিতে রাখতে বসানো হয়েছে ৪টি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার (Watch Tower)। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় র্যাবের স্নাইপার (Sniper) এবং বোম ডিসপোজাল ইউনিট (Bomb Disposal Unit) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।
মুসল্লিদের জন্য কঠোর নির্দেশনা ও তল্লাশি নিরাপত্তার স্বার্থে এবারও মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মুসল্লিরা কেবল জায়নামাজ সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন। ব্যাগ, ছাতা বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাঠে প্রবেশের আগে মুসল্লিদের ৪টি নিরাপত্তা চৌকি পার হতে হবে। প্রতিটি প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর (Metal Detector) দিয়ে দেহ তল্লাশির পর আর্চওয়ের (Archway) ভেতর দিয়ে মুসল্লিরা নির্ধারিত কাতারে প্রবেশ করবেন। সব মিলিয়ে ১,১০০ পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা মাঠের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবেন।
যাতায়াতে বিশেষ ব্যবস্থা: ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল’ ট্রেন দূরদূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে প্রতি বছরের মতো এবারও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় এবং ময়মনসিংহ থেকে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে দুটি ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল’ ট্রেন কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে আসবে। জামাত শেষে দুপুর ১২টায় ট্রেন দুটি পুনরায় ফিরতি যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যে রওনা হবে।
ঐতিহ্য ও নামতত্ত্বের ইতিহাস আড়াইশ বছরের প্রাচীন এই ঈদগাহের আয়তন প্রায় ৬ একর। লোককথা অনুযায়ী, ১৮২৮ সালে এই মাঠে প্রথম বড় জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই ‘সোয়া লাখ’ থেকেই মাঠটির নাম হয় ‘সোয়া লাখিয়া’, যা কালক্রমে ‘শোলাকিয়া’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
উন্নয়নের অঙ্গীকার ও বর্তমান প্রস্তুতি কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানিয়েছেন, মাঠের লাইন টানা, নতুন করে রং করা এবং ওজুখানা মেরামতের কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, নতুন সরকারের মেয়াদে শোলাকিয়া মাঠের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার আরও আধুনিকায়ন করা হবে।
একত্রে কয়েক লাখ মানুষের মোনাজাত আর ঐতিহ্যের আবহে এবারও শোলাকিয়া হয়ে উঠবে সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল। প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে এবারের ঈদ জামাত সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।