মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার পারদ চড়ছে। ইরান ও ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসরাইল ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আর কোনো হামলা চালাবে না। তবে একই সঙ্গে কাতার বা অঞ্চলের অন্য কোনো মার্কিন মিত্রের জ্বালানি স্থাপনায় তেহরান পুনরায় আঘাত হানলে ইরানকে ‘ভয়াবহ’ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
সাউথ পার্স ও আনজালি বন্দরে ইসরাইলি হামলা
গত বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের বুশেহর অঞ্চলের আসালুয়েহ উপকূলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ‘সাউথ পার্স’ (South Pars Gas Field) লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলা চালায় ইসরাইল। একই সময়ে ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় আনজালি বন্দরে নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটিতেও আঘাত হানা হয়। উল্লেখ্য, সাউথ পার্স কেবল ইরানের নয়, এটি কাতার ও ইরান উভয় দেশের একটি যৌথ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ‘Energy Hub’।
ইরানের প্রতিশোধ ও মিত্র দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তেহরান সরাসরি কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বিশেষ করে কাতারের ‘রাস লাফান’ (Ras Laffan) এলএনজি স্থাপনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কাতারএনার্জি (QatarEnergy)।
এই ঘটনার পর কাতার সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটিতে নিযুক্ত ইরানি দূতাবাসের মিলিটারি এবং সিকিউরিটি অ্যাটাশেসহ সংশ্লিষ্ট স্টাফদের ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (Persona Non Grata) ঘোষণা করে অবিলম্বে দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের বিতর্কিত দাবি ও হুঁশিয়ারি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) দেওয়া এক পোস্টে ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলের এই হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন পূর্বাহ্নে কিছুই জানত না। যদিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN) গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় (Coordination) করেই ইসরাইল এই অপারেশন চালিয়েছে।
ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে ইসরাইল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে একটি সহিংস হামলা চালিয়েছে। তবে এটি ছিল ওই বিশাল স্থাপনার একটি তুলনামূলক ছোট অংশে।” তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, কাতার বা সৌদি আরবের মতো শান্তিপ্রিয় প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালানো ‘অন্যায্য ও অযৌক্তিক’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমি এই পর্যায়ে বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞ চাই না কারণ এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব (Long-term impact) রয়েছে। কিন্তু যদি তেহরান আবারও কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওই গ্যাসক্ষেত্রটিকে এমন শক্তি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেবে, যা ইরান আগে কখনও কল্পনাও করেনি।”
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আগামী দিনের আশঙ্কা
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে কাতার তাদের স্থাপনা খালি করতে সক্ষম হলেও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক গ্যাস সরবরাহে। ইরান আগেই হুমকি দিয়েছিল যে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা ‘জিসিসি’ (GCC) অঞ্চলের পাঁচটি প্রধান জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কড়া বার্তা একদিকে যেমন ইসরাইলকে সংযত করার চেষ্টা, অন্যদিকে ইরানকে সরাসরি যুদ্ধের হুঁশিয়ারি। তবে সাউথ পার্সের মতো একটি স্থাপনা ধ্বংস করার হুমকি বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘Market Value’ এবং তেলের দামের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয়, বরং তা ‘Global Energy Security’-র জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।