মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন সামরিক শক্তি নিয়ে শুরু হয়েছে বাগযুদ্ধ। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) তৈরির সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে—ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এমন চাঞ্চল্যকর দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (IRGC) জানিয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কাজ কেবল সচলই নয়, বরং তা চলছে ‘পুরোদমে’।
শুক্রবার (২০ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘দৈনিক ইরান’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইআরজিসির মুখপাত্র জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাঈনির এই হুঁশিয়ারি সম্বলিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
‘বিশালের মধ্যে বিশ’: ইরানের নিখুঁত সক্ষমতা ইসরায়েলি দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে জেনারেল নাঈনি এক অভিনব উপমায় ইরানের সামরিক শক্তির বর্ণনা দেন। ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বা নিখুঁত নম্বর হিসেবে ‘২০’ (Score 20) বিবেচনা করা হয়। সেই উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের (Missile Industry) সক্ষমতার স্কোর এখন পূর্ণাঙ্গ ২০। এই বিষয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। আমরা এখন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আর এই সংকটের মধ্যেই আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে—যা বিশ্ববাসীর জন্য বিস্ময়কর।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, সামরিক সরঞ্জাম বা ক্ষেপণাস্ত্র মজুত (Stockpiling) করার ক্ষেত্রে তেহরান কোনো ধরনের সংকটের মুখে নেই। আইআরজিসির এই শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, তাদের ‘Defense Inventory’ বা প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার বর্তমানে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
নেতানিয়াহুর সেই বিস্ফোরক দাবি এর আগে গত বৃহস্পতিবার এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন, “আমরা জয়ের পথে রয়েছি এবং ইরান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।” নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল—ইরান কি সত্যিই তার দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা হারিয়েছে? তবে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই আইআরজিসি সেই জল্পনায় জল ঢেলে দিল।
অস্তিত্বের লড়াই ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের শপথ কেবল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনই নয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জেনারেল নাঈনি। তিনি ইরানের সাধারণ মানুষের মনোভাব ব্যাখ্যা করে বলেন, “এখানকার মানুষ চায় শত্রু পুরোপুরি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলুক। আমাদের ভূখণ্ড থেকে যুদ্ধের কালো ছায়া যতক্ষণ সরে না যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে না।”
সামরিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে ‘Missile Capability’ বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একটি দেশের প্রধান ‘Deterrent’ বা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। ইরান যদি সত্যিই যুদ্ধের মধ্যে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) পুনরায় পরিবর্তন করে দিতে পারে। বিশেষ করে ড্রোন এবং নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে তেহরান যে প্রযুক্তিতে অগ্রসর হয়েছে, তা ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (Air Defense System) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে ইরানের এই সামরিক শক্তির আস্ফালন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।