ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘খারগ দ্বীপ’ (Kharg Island) দখলের এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে আনাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios) শুক্রবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে।
খারগ দ্বীপ: কেন এটি ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য? পারস্য উপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত খারগ দ্বীপ ইরানের জন্য কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং দেশটির অর্থনীতির জীবনীশক্তি। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের টার্মিনালগুলোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত ও জাহাজীকরণ করা হয়। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে বা এটি সম্পূর্ণ অবরোধ (Blockade) করতে পারলে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত দেখতে চান। যদি এর জন্য উপকূলীয় আগ্রাসন প্রয়োজন হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই পথেই হাঁটবে।”
রণকৌশল ও সামরিক প্রস্তুতি পেন্টাগন (Pentagon) ও হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনায় উঠে এসেছে এক দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযানের ছক। একটি সূত্র জানিয়েছে, খারগ দ্বীপ দখলের আগে অন্তত এক মাস ধরে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে আকাশপথে হামলা চালিয়ে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হবে। এরপরই শুরু হতে পারে স্থল অভিযান। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই ওই অঞ্চলে নৌবাহিনীর তিনটি ইউনিট পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ২,৫০০ সদস্যের একটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ফোর্স’ (Marine Expeditionary Force) মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে। আরও দুটি সমপরিমাণ ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি ও বিমান হামলা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প খারগ দ্বীপকে ‘অরক্ষিত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী যেকোনো সময় দ্বীপটি দখল করতে পারে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা পাইপলাইনগুলো বাদে সেখানকার প্রায় সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে দিয়েছি। পাইপলাইনগুলো রাখা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে তেল উৎপাদন ব্যাহত না হয়, কারণ সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে দীর্ঘ সময় লাগে।” উল্লেখ্য, গত শুক্রবারই মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ওই দ্বীপের বেশ কিছু সামরিক বাঙ্কারে ব্যাপক বোমা বর্ষণ করেছে, যাকে বড় কোনো অভিযানের ‘ভিত্তিপ্রস্তর’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা তবে এই ‘Tactical’ পরিকল্পনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি সতর্ক করে বলেছেন, খারগ দ্বীপ দখল করতে গেলে মার্কিন সেনাদের জীবন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। তিনি মনে করেন, দ্বীপটি দখল করলেই যে ইরান জ্বালানি সরবরাহ সচল করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং তেহরান অন্য কোনো পথে সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। তার পরামর্শ হলো, সরাসরি স্থল অভিযানের চেয়ে ডেস্ট্রয়ার ও যুদ্ধবিমানের পাহারায় তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে (Oil Tanker) নিরাপদে পার করে দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিশ্ববাজার আগামী মার্চের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। তার আগেই তিনি এই যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালির এই সংকট ‘Energy Market’-এ যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা মার্কিন অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর টম কটন ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানকে ‘বিচক্ষণতা’ বলে অভিহিত করলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই সরাসরি অভিযানে যায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বরাজনীতির পুরো মানচিত্র বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, তেহরান এই চাপের মুখে নতিস্বীকার করে নাকি পাল্টা কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়।