রুপালি পর্দার ট্র্যাজেডি যখন বাস্তব ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যিনি হাজারো গল্প ফুটিয়ে তুলতেন, সেই চিরচেনা মানুষটিই এবার নিজে এক বিষাদময় গল্পের নায়ক হয়ে বিদায় নিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দুই বাংলায়। রোববার (২৯ মার্চ) দিঘার কাছে ওড়িশার তালসারি সমুদ্রসৈকতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তার এই চলে যাওয়া টলিউডের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তালসারির লোনা জলে মর্মান্তিক সেই মুহূর্ত প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাহুল সেখানে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ নামক একটি নতুন মেগা ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিং (Outdoor Shooting) করছিলেন। দৃশ্য ধারণের এক পর্যায়ে তিনি সমুদ্রের পানিতে নামেন এবং আচমকাই উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে তলিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শী ও ইউনিট সদস্যদের চিৎকারে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যখন তাকে পানি থেকে তোলা হয়, তখন তিনি সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ছিলেন। দ্রুত তাকে দিঘা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ধোঁয়াশা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রাহুলের এই মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। ঠিক কী পরিস্থিতিতে তিনি সমুদ্রে নেমেছিলেন, তা নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে। তিনি কি কেবল চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে ‘On-camera’ শট দিতে পানিতে নেমেছিলেন, নাকি শুটিংয়ের বিরতিতে ব্যক্তিগতভাবে সমুদ্রে গিয়েছিলেন—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তার সহ-অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ইউনিটের একটি বড় অংশ তখন দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিল। রাহুল জানিয়েছিলেন তিনি আরও কয়েকটি শট দিতে চান। এর কিছুক্ষণ পরেই তার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর আসে। এই ঘটনায় শুটিং সেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Safety Protocol) নিয়েও টালিপাড়ায় মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ থেকে ওটিটি কাঁপানো যাত্রা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘Versatile Actor’ যিনি নিজেকে বারবার ভেঙেছেন। ২০০৮ সালে রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমার মাধ্যমে তার ‘Breakthrough’ ঘটে। সেই থেকে তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ‘জ্যাকপট’, ‘পরাণ যায় জ্বলিয়া রে’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘জুলফিকার’ থেকে শুরু করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের (OTT Platforms) আধুনিক সব কাজ—সবখানেই ছিল তার অবাধ বিচরণ।
ছোট পর্দাতেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘খেলা’, ‘মোহনা’, ‘দেশের মাটি’ কিংবা বর্তমানের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘গীতা এলএলবি’—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি সাধারণ মানুষের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তার অভিনয় দক্ষতা তাকে ভিন্ন ঘরানার সিনেমা এবং মূলধারার কমার্শিয়াল (Commercial Cinema) উভয় ক্ষেত্রেই সমান জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
স্তব্ধ সহকর্মী ও অনুরাগী মহল কয়েক ঘণ্টা আগেও যিনি শুটিং ফ্লোরে প্রাণোচ্ছ্বল ছিলেন, তার এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। স্টুডিও পাড়ার অলিগলি থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সবই এখন রাহুল-স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত। তার অকাল প্রয়াণ কেবল একজন দক্ষ শিল্পীকেই হারাল না, বরং বাংলা বিনোদন জগত হারাল এক নির্ভীক সৃজনশীল সত্তাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেলেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া অসংখ্য কাজ ও অমলিন হাসি দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।