• জীবনযাপন
  • হামের হানা: আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াবেন যেভাবে, জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিকার

হামের হানা: আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াবেন যেভাবে, জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিকার

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
হামের হানা: আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াবেন যেভাবে, জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিকার

শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতির আগে ও পরে করণীয় নিয়ে চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ; সঠিক সময়ে টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন হতে পারে জীবন রক্ষাকারী বর্ম

জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে পরিচিত হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার হলেও অসচেতনতার কারণে অনেক সময়ই এই রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। তবে আশার কথা হলো, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পরও সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি ও অসুস্থতার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।

সংক্রমণের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা: জীবন রক্ষাকারী 'পোস্ট-এক্সপোজার' টিকা

হামের ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন বুঝতে পারলে কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে ‘পোস্ট-এক্সপোজার’ ট্রিটমেন্ট বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়:

১. এমএমআর টিকা (MMR Vaccine): হাম, মাম্পস এবং রুবেলা (MMR) প্রতিরোধক টিকা যদি ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রহণ করা যায়, তবে তা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে সংক্রমণ রুখতে বা রোগের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের আগে টিকা দেওয়া হয়নি, তাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।

২. হিউম্যান নরমাল ইমিউনোগ্লোবুলিন (HNIG): যারা শারীরিক কারণে বা বয়সের সীমাবদ্ধতায় টিকা নিতে পারেন না, তাদের জন্য এইচএনআইজি (HNIG) ইনজেকশন অত্যন্ত কার্যকর। এটি মূলত একটি অ্যান্টিবডি যা তাৎক্ষণিক সুরক্ষা প্রদান করে। সংক্রমণের ছয় দিনের মধ্যে এটি গ্রহণ করতে হয়। এটি সাধারণত ৬ মাসের কম বয়সী শিশু, গর্ভবতী নারী এবং যাদের ইমিউন সিস্টেম (Immune System) বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল (যেমন- এইচআইভি বা ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী) তাদের জন্য সুপারিশ করা হয়।

অদৃশ্য ঘাতক: হাম যেভাবে ছড়ায় শরীরে ও বাতাসে

হাম বিশ্বের অন্যতম উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতা সম্পন্ন (Highly Contagious) ভাইরাল ডিজিজ। এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির নাক ও গলার মিউকাস মেমব্রেনে অবস্থান করে। হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নির্গত রেসপিরেটরি ড্রপলেটস (Respiratory Droplets) বা ক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমে এটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও ভাইরাস কণাগুলো বাতাসে বা কোনো পৃষ্ঠে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এমনকি লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৪ দিন আগে থেকেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই ভাইরাসটি অন্যের শরীরে ছড়িয়ে দিতে পারেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যদি কোনো ঘরে একজন হামের রোগী থাকেন এবং সেখানকার বাকিরা টিকা না নেওয়া থাকেন, তবে তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

লক্ষণ চিনবেন যেভাবে: প্রাথমিক উপসর্গ ও ফুসকুড়ি

হামের লক্ষণগুলো সাধারণত সংক্রমণ হওয়ার ১০ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পায়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ইনকিউবেশন পিরিয়ড (Incubation Period) বলা হয়।

প্রাথমিক পর্যায় (প্রথম ৩-৪ দিন): শুরুতে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো মনে হলেও দ্রুতই তীব্র জ্বর (১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত) অনুভূত হয়। সাথে থাকে শুকনো কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া (Conjunctivitis)। অনেক ক্ষেত্রে আলোর দিকে তাকালে চোখে অস্বস্তি বা ফটোফোবিয়া (Photophobia) হতে পারে।

কোপলিক স্পটস (Koplik spots): হামের একটি অনন্য লক্ষণ হলো গালের ভেতরের দিকে বা মাড়ির পাশে ছোট ছোট সাদাটে দাগ দেখা যাওয়া। চিকিৎসকরা একে ‘কোপলিক স্পটস’ বলেন, যা মূল ফুসকুড়ি বা র্যাশ ওঠার আগেই দেখা দেয়।

ফুসকুড়ি বা র্যাশের বিস্তার: জ্বর শুরুর ৩ থেকে ৫ দিন পর শরীরে লালচে-বাদামী ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এটি সাধারণত কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে মুখমণ্ডল, ঘাড় এবং ক্রমান্বয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত এই ফুসকুড়ি স্থায়ী হতে পারে এবং তা মিলিয়ে যাওয়ার সময় জ্বরও কমতে শুরু করে।

জটিলতা ও সতর্কতা

হামকে কেবল সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি ভেবে অবহেলা করা প্রাণঘাতী হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা না পেলে এটি নিউমোনিয়া (Pneumonia), কানে ইনফেকশন বা এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের (Encephalitis) মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে এটি শিশুদের অন্ধত্ব বা পুষ্টিহীনতার কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানের (Vaccination) কোনো বিকল্প নেই। আপনার শিশুর টিকাদান কার্ড যাচাই করুন এবং লক্ষণ দেখা মাত্রই তাকে আইসোলেশন বা অন্যদের থেকে আলাদা রাখুন। সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনে ভাইরাসের বিস্তার রোধে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Tags: health tips viral infection child health immune system healthcare bangladesh measles prevention mmr vaccine contagious diseases measles symptoms vaccination guide