আটলো মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। অ্যাপোলো মিশনের প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর, আবারও পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথে মানবজাতিকে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। বহুল প্রতীক্ষিত ‘আর্টেমিস-২’ (Artemis II) মিশনের জন্য নির্বাচিত চার চৌকস নভোচারী এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এই ঐতিহাসিক মহাকাশ যাত্রার সূচনা হতে পারে।
চন্দ্রজয়ের পথে নতুন মাইলফলক: কী আছে আর্টেমিস-২ মিশনে?
নাসার উচ্চাভিলাষী আর্টেমিস প্রোগ্রামের দ্বিতীয় ধাপ হলো এই মিশন। গত শুক্রবার এই মিশনের জন্য নির্বাচিত চার নভোচারী ফ্লোরিডায় এসে পৌঁছেছেন। এটি কোনো সাধারণ মিশন নয়, বরং মহাকাশ বিজ্ঞানে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক নতুন লড়াই। প্রায় ১০ দিনের এই সফরে নভোচারীরা নাসার সর্বাধুনিক ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (Space Launch System - SLS) রকেটে চড়ে মহাশূন্যে পাড়ি দেবেন। তাদের বাহন হিসেবে থাকবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ‘ওরিয়ন ক্রু ক্যাপসুল’ (Orion Crew Capsule)। এই অভিযানে তারা চাঁদের পৃষ্ঠে না নামলেও অত্যন্ত উচ্চগতিতে চন্দ্রপৃষ্ঠের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, যা ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানব প্রেরণের পথ প্রশস্ত করবে।
ইতিহাসের মুখোমুখি চার নক্ষত্র: কারা যাচ্ছেন চাঁদের পথে?
আর্টেমিস-২ মিশনের জন্য নাসা এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি (CSA) অত্যন্ত অভিজ্ঞ এক দল গঠন করেছে। এই দলে রয়েছেন তিন মার্কিন এবং এক কানাডিয়ান নভোচারী:
১. রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman): মিশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। ২০১৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (ISS) ১৬৫ দিন কাটানোর বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে তার ঝুলিতে। ২. ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover): মিশনের পাইলট হিসেবে থাকছেন তিনি। ২০২০ সালে এলন মাস্কের টেক জায়ান্ট (Tech Giant) কোম্পানি স্পেসএক্স-এর ‘ক্রু-১’ মিশনে অংশ নিয়ে ১৬৮ দিন মহাকাশে থাকার রেকর্ড রয়েছে তার। ৩. ক্রিস্টিনা কচ (Christina Koch): মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৯ সালে মহাকাশে টানা ৩২৮ দিন অবস্থান করে নারীদের মধ্যে দীর্ঘতম মহাকাশ যাত্রার বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন তিনি। ৪. জেরিমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen): কানাডিয়ান স্পেস এজেন্টের এই নভোচারীর জন্য এটিই হবে প্রথম মহাকাশ ভ্রমণ। তবে গভীর মহাকাশ গবেষণায় তার দীর্ঘ প্রশিক্ষণ মিশনটিকে আরও শক্তিশালী করবে।
প্রযুক্তির শিখরে ওরিয়ন ও এসএলএস রকেট
আর্টেমিস-২ মিশনে ব্যবহৃত ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস রকেটটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট হিসেবে স্বীকৃত। এটি মহাকাশের গভীরে ‘ডিপ স্পেস’ (Deep Space) অভিযানের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি বায়ুমণ্ডলের তীব্র ঘর্ষণ ও তাপ সহ্য করে নভোচারীদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারে। এই মিশনে নভোচারীরা সিস্টেম চেকআউট এবং রিয়েল-টাইম ডাটা (Real-time Data) বিশ্লেষণের মাধ্যমে মহাকাশযানের কার্যকারিতা যাচাই করবেন।
মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্ত
নাসার এই মিশনটি কেবল চাঁদে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নয়, বরং মহাকাশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বড় পরীক্ষা। আর্টেমিস-২ সফল হলে পরবর্তী ধাপে আর্টেমিস-৩ মিশনে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সরাসরি মানুষ নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে নাসার। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মিশনগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভবিষ্যতে একটি ‘লুনার গেটওয়ে’ বা চন্দ্র স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করবে, যা মানবজাতিকে আরও দূরে— লাল গ্রহ মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাবে।
পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের দিকে। মানুষের অদম্য কৌতূহল আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে শুরু হতে যাওয়া এই যাত্রা মহাকাশ বিজ্ঞানের পাতায় এক নতুন স্বর্ণালী অধ্যায় যোগ করতে যাচ্ছে।