ব্যবহারকারীদের অনলাইন নিরাপত্তা (Online Safety) নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং শিশুদের সুরক্ষায় চরম গাফিলতির দায়ে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্ট (Tech Giant) মেটাকে (Meta) মোটা অংকের আর্থিক জরিমানা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি জুরি বোর্ড দীর্ঘ শুনানি শেষে এই রায় প্রদান করে। মূলত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের যৌন শোষণ ও হয়রানি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে মেটাকে এই মাশুল গুনতে হচ্ছে।
ঐতিহাসিক রায়: ৭৫ হাজার বার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজের দায়ের করা এই মামলার শুনানি চলে টানা ছয় সপ্তাহ। জুরি বোর্ড মাত্র এক দিনেরও কম সময় আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইন (Consumer Protection Law) লঙ্ঘন করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, প্রতিষ্ঠানটি মোট ৭৫ হাজার বার এই আইন ভঙ্গ করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ৫ হাজার ডলার করে জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মোট অংক কয়েক কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
রায়ের পর এক বিবৃতিতে রাউল তোরেজ একে শিশু ও পরিবারের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এই রায় স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, কোনো কোম্পানিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। মুনাফার লোভে শিশুদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলার দিন শেষ হতে চলেছে।”
গোপন তদন্তে থলের বিড়াল: যেভাবে ধরা পড়ল মেটা
এই চাঞ্চল্যকর মামলার সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৩ সালের একটি বিশেষ গোপন তদন্ত (Undercover Investigation) থেকে। তদন্তকারীরা ১৪ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীর ছদ্মনাম ও পরিচয়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলেন। তদন্তে দেখা যায়, অ্যাকাউন্ট খোলার পরপরই ওই ‘শিশুরা’ অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে আপত্তিকর যোগাযোগের শিকার হচ্ছে। অ্যালগরিদম (Algorithm) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে মেটা যেখানে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়ার দাবি করত, বাস্তবে সেখানে ‘প্রিডেটরদের’ অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে।
মেটার প্রতিক্রিয়া ও আপিলের ঘোষণা
আদালতের এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে মেটা কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল (Appeal) করবেন। মেটার দাবি, প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট (Harmful Content) শনাক্ত করা একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া। তাদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করেছে এবং ব্যবহারকারীদের কাছে কোনো তথ্য গোপন করেনি।
প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় কেবল মেটা নয়, বরং গুগল, টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর জবাবদিহিতার চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য (Mental Health) এবং অনলাইন আসক্তি (Addiction) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মামলা চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন (Design) করেছে যা তরুণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
আগামী মে মাসে মামলার পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আদালত মেটাকে তাদের প্ল্যাটফর্মের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও ডাটা প্রাইভেসিতে (Data Privacy) আমূল পরিবর্তন আনার নির্দেশ দিতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা (Cybersecurity) বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিউ মেক্সিকোর এই রায় অনলাইন নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিমালায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।