মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান থেকে প্রায় ১,০০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম (Uranium) সরিয়ে নিতে দেশটিতে বড় ধরনের এক সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছেন বলে জানা গেছে। রোববার প্রকাশিত ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অপারেশনটি কেবল একটি বিমান হামলা বা ড্রোন অ্যাটাক নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত জটিল গ্রাউন্ড অপারেশন (Ground Operation), যার ফলে মার্কিন বাহিনীকে কয়েক দিন বা তারও বেশি সময়ের জন্য ইরানের অভ্যন্তরে অবস্থান করতে হতে পারে।
পারমাণবিক ভাণ্ডারের লক্ষ্যবস্তু: ইসফাহান ও নাতাঞ্জ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু হলো ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। ধারণা করা হচ্ছে, ১,০০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম বর্তমানে ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং নাতাঞ্জের একটি বিশেষ ভাণ্ডারে মজুত রয়েছে। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি (Nuclear Weapon) থেকে চিরতরে বিরত রাখতেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপের কথা ভাবছেন ট্রাম্প। আলোচনার মাধ্যমে উপাদানটি হস্তান্তর করা না হলে শক্তি প্রয়োগ করে তা জব্দ (Seize) করার বিষয়ে তিনি বদ্ধপরিকর।
বিপজ্জনক ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ঝুঁকি অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেল এই পরিকল্পনার জটিলতা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটা চটজলদি ভেতরে ঢুকে বেরিয়ে আসার মতো কোনো সাধারণ কমান্ডো অপারেশন (Commando Operation) নয়।” এই অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনীকে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) ও স্থল হামলার হুমকির মুখে সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে হবে। বিশেষায়িত দলগুলোকে এই উপাদান খুঁজে বের করার সুযোগ দিতে ওই এলাকাগুলো কয়েক দিন ধরে সুরক্ষিত রাখতে হবে, যা প্রকারান্তরে একটি খণ্ডযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
লজিস্টিকস ও পরিবহনের জটিলতা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ১,০০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া এক বিশাল লজিস্টিকস (Logistics) চ্যালেঞ্জ। এই উপাদানগুলো সম্ভবত ৪০ থেকে ৫০টি বিশেষায়িত কন্টেইনারে সংরক্ষিত থাকবে। সেগুলোকে অত্যন্ত সুরক্ষিত পরিবহন কাস্কে (Transport Cask) ভরে ট্রাকের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে নিতে হবে এবং পরবর্তীতে আকাশপথে ইরানের সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কূটনীতি বনাম সামরিক শক্তি হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, পেন্টাগনের কাজ হলো সর্বাধিনায়ককে সব ধরনের বিকল্প বা অপশন (Options) দেওয়া। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ট্রাম্প এখনো অভিযানের ঝুঁকি ও মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইরান যেন স্বেচ্ছায় এই ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করে।
মধ্যস্থতায় তিন দেশ: কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও সচল ট্রাম্প কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছেন না, সমান্তরালভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও উৎসাহিত করছেন। জানা গেছে, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিশরের মতো দেশগুলো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ মধ্যস্থতাকারী (Mediators) হিসেবে কাজ করছে। যদি একটি সমঝোতার মাধ্যমে ইরান ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হয়, তবে রক্তক্ষয়ী এই অভিযান এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘সব বা কিছু নয়’ (All or Nothing) নীতি মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সূচনা করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি বাজার এবং নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।