মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট তৈরির একটি অসাধু প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই সংকট নিরসনে এবং জ্বালানি বণ্টন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে সরকার এবার বড় ধরনের ‘Digital Transformation’-এর পথে হাঁটছে। এপ্রিল মাস থেকেই দেশজুড়ে কিউআর কোড (QR Code) ভিত্তিক ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ (Fuel Pass) ব্যবস্থা চালুর জোরালো প্রস্তুতি শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ।
স্মার্ট পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত হবে জ্বালানি সরবরাহ
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি যানবাহনের জন্য জ্বালানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে নিবন্ধিত যানবাহনগুলো নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি (পেট্রোল ও অকটেন) ক্রয় করতে পারবে। প্রাথমিকভাবে এই ‘Pilot Project’-এর আওতায় আনা হচ্ছে দেশের বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেল চালককে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানান, “আমরা ইতিমধ্যে একটি অত্যাধুনিক অ্যাপ ‘Develop’ করেছি। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই দুই-একটি জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে বা ‘Test Run’ হিসেবে এটি চালু করতে পারব।”
সারা দেশে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনটি বড় পরিসরে হওয়ার কারণে সরকার কিছুটা সতর্কভাবে এগোচ্ছে। যুগ্মসচিব আরও যোগ করেন, “একযোগে সারা দেশে এই ব্যবস্থা চালু করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। তাই আমরা প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনকে লক্ষ্য করে দ্রুত একটি কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।” এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি পাম্পে জ্বালানি বিক্রির তথ্য ‘Real-time Data’ হিসেবে সরকারি সার্ভারে জমা হবে, যা মজুতদারদের শনাক্ত করতে সহায়ক হবে।
ম্যানুয়াল থেকে ডিজিটালে উত্তরণ
বর্তমানে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন এবং অভ্যন্তরীণ কয়েকটি জেলায় জ্বালানি তেলের অবৈধ পাচার ও মজুত রুখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘Manual Fuel Card’ চালু করা হয়েছে। সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গা ও সিরাজগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে পেট্রোল ও অকটেন কেনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরযুক্ত কার্ড দেখানো বাধ্যতামূলক।
সাতক্ষীরায় প্রতিটি মোটরসাইকেল চালকের জন্য নির্ধারিত এই কার্ডে যানবাহন ও চালকের বিস্তারিত তথ্য থাকে। পাম্প থেকে তেল নেওয়ার সময় সেখানে তারিখ ও পরিমাণের তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। জেলা প্রশাসনের এই সফল মডেলটিকেই এবার ‘Digital’ রূপ দিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চায় সরকার, যাতে করে ‘Data Analytics’ ব্যবহার করে জ্বালানির অপচয় ও অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিউআর কোড ভিত্তিক এই ‘Fuel Management System’ কার্যকর হলে জ্বালানি খাতের ‘Supply Chain’-এ স্বচ্ছতা আসবে। এটি কেবল অবৈধ মজুতই রোধ করবে না, বরং দেশে ‘Energy Security’ বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। বৈশ্বিক এই অস্থির সময়ে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য জ্বালানির প্রাপ্যতা সহজলভ্য রাখতেই এই জনবান্ধব ও প্রযুক্তি নির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।