মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবার এক চরম ও ভয়াবহ মোড় নিল। কয়েক স্তরের অত্যাধুনিক Air Defense সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে ইসরায়েলের প্রাণকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিবসহ মধ্যাঞ্চলের একাধিক স্থানে সরাসরি আঘাত হেনেছে ইরানের শক্তিশালী Ballistic Missile। বুধবার (১ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকালে এই আকস্মিক হামলায় কেঁপে ওঠে গোটা ইসরায়েল। বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে জনবহুল বেনি ব্রাক এলাকাকে, যেখানে একটি আবাসিক ভবনে সরাসরি আছড়ে পড়েছে ইরানের ছোড়া উচ্চপ্রযুক্তির ক্লাস্টার মিসাইল।
বেনি ব্রাকে সরাসরি আঘাত: গ্রাউন্ড জিরোর চিত্র হিব্রু ভাষার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'চ্যানেল-১২' (Channel-12) জানিয়েছে, বুধবার সকালে ইরান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ছোড়া শুরু হলে মুহূর্তের মধ্যেই ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল জুড়ে সাইরেনের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তেল আবিবের আকাশে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুনের কুণ্ডলী দেখা যায়। এর মধ্যেই একটি ক্লাস্টার মিসাইল সরাসরি বেনি ব্রাক এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনটির একাংশ ধসে পড়ে এবং আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেছে।
হতাহতের সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রাথমিক সংবাদে তিনজনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ১৪ জন ইসরায়েলি নাগরিক আহত হয়েছেন। মেডিকেল টিমের সূত্রমতে, আহতদের মধ্যে একজন কিশোরীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এছাড়া আরও দুইজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বাকি ১১ জন সামান্য আহত হলেও তারা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা 'মাগেন ডেভিড আদম' জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকায় আরও কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্যালিস্টিক ও ক্লাস্টার প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এই হামলায় সাধারণ রকেটের বদলে উন্নতমানের Ballistic Cluster Missile ব্যবহার করেছে। এই ধরনের মিসাইল মাঝ আকাশে অসংখ্য ছোট ছোট বোমায় (Sub-munitions) বিভক্ত হয়ে যায়, যা একটি বিশাল এলাকা জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। ইসরায়েলের তথাকথিত অপরাজেয় 'Iron Dome' বা 'Arrow' ডিফেন্স সিস্টেম কেন এই মিসাইলগুলো পুরোপুরি প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলো, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই সামরিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান তাদের এই হামলায় এমন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে যা রাডার সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম।
অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য ও যুদ্ধের মেঘ তেল আবিবের মতো সুরক্ষিত স্থানে সরাসরি আঘাত আসায় ইসরায়েলি প্রশাসনের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই হামলার পর ইসরায়েলজুড়ে 'Red Alert' জারি করা হয়েছে এবং নাগরিকদের বাঙ্কারে অবস্থানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক রাজধানীতে এই হামলা দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের (Full-scale War) আশঙ্কা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই হামলার পাল্টা জবাবে ইসরায়েল কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান পরিস্থিতি বর্তমানে বেনি ব্রাকসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আকাশপথে নজরদারি বাড়াতে ড্রোন ও হেলিকপ্টার টহল দিচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (IDF) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের এই ধৃষ্টতাপূর্ণ হামলার সমুচিত জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনার পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।