মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মাঝেই এবার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে টালমাটাল ইরান। দেশটির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রশাসন এবং প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (IRGC)-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। এই চরম উত্তেজনা তেহরানকে এক ‘Political Deadlock’ বা পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, আইআরজিসি কার্যত রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।
কোণঠাসা প্রেসিডেন্ট ও আইআরজিসি-র ছায়া শাসন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি বর্তমানে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রস্থল ঘিরে একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। তারা প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন ‘Presidential Appointments’ বা নিয়োগ এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তসমূহ আটকে দিচ্ছে। এর ফলে মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার কার্যত ‘Executive Control’ বা নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি কতটা সংঘাতময়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় গত বৃহস্পতিবারের একটি ঘটনায়। নতুন গোয়েন্দা মন্ত্রী নিয়োগের জন্য প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা আইআরজিসি প্রধান কমান্ডার আহমদ ভাহিদির সরাসরি চাপে ভেস্তে যায়। হোসেন দেহগানসহ অন্যান্য যোগ্য প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করা হলেও ভাহিদি তা সটান প্রত্যাখ্যান করেন। ভাহিদির যুক্তি ছিল, বর্তমান ‘Wartime Situation’ বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সকল সংবেদনশীল পদের নেতৃত্ব সরাসরি আইআরজিসি-র পছন্দের তালিকা থেকেই আসতে হবে।
মোজতবা খামেনির অবস্থান ও ‘মিলিটারি কাউন্সিল’-এর উত্থান
ইরানের রাজনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ নেতার সবুজ সংকেত পাওয়ার পরেই গোয়েন্দা মন্ত্রীদের মনোনীত করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার পুত্র মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করা হলেও, বর্তমান রণ পরিস্থিতিতে তিনি আসলে কোথায় আছেন বা কার অধীনে আছেন, তা স্পষ্ট নয়।
সূত্র জানায়, আইআরজিসি-র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ ‘Military Council’ এখন রাষ্ট্রের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করেছে। তারা মোজতবা খামেনিকে ঘিরে একটি দুর্ভেদ্য ‘Security Bubble’ বা নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে এবং সরকারের কোনো রিপোর্ট বা তথ্য যেন তার কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেই পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বারবার মোজতবার সঙ্গে জরুরি বৈঠকের অনুরোধ জানালেও রহস্যজনক কারণে কোনো সাড়া মেলেনি।
আলী আসগর হেজাজি ও উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব
এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যেই মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ মহলে এক নজিরবিহীন ফাটল দেখা দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী আসগর হেজাজিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। হেজাজির মূল অপরাধ—তিনি বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের ঘোর বিরোধী। হেজাজি বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে বসার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই এবং তাকে এই উচ্চ পদে বসানো হলে কার্যত দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসি-র হাতে চলে যাবে।
হেজাজি মনে করেন, আইআরজিসি-র এই একাধিপত্য ইরানের বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেবে। উল্লেখযোগ্য যে, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ইসরাইলি বিমান হামলায় হেজাজিকে টার্গেট করা হলেও তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বলে জানা গেছে।
অনিশ্চয়তার মুখে তেহরানের ভবিষ্যৎ
একদিকে বৈদেশিক আগ্রাসন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ‘Power Struggle’—এই দ্বিমুখী সংকটে ইরানের ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায়। প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক ক্ষমতা খর্ব করে আইআরজিসি-র এই ‘Military Takeover’ বা সামরিক কব্জা রাষ্ট্রটিকে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আইআরজিসি কি শেষ পর্যন্ত ইরানের পূর্ণ ক্ষমতা কুক্ষিগত করবে, নাকি পেজেশকিয়ান প্রশাসন কোনোভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করতে পারবে—সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।