মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ঘনীভূত হওয়া উত্তেজনার মাঝে এবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদে এক ভয়াবহ অপহরণের শিকার হলেন মার্কিন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শেলি কিটেলসন (Shelley Kittelson)। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যায় ব্যস্ত রাজপথ থেকে অস্ত্রধারীরা তাকে তুলে নিয়ে যায় বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে পুরো অঞ্চল এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সিনেমাটিক অপহরণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর রুদ্ধশ্বাস অভিযান
ইরাকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাগদাদের একটি জনবহুল এলাকায় অজ্ঞাত পরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা দুই-তিনটি গাড়ি নিয়ে ওই নারী সাংবাদিকের গতিরোধ করে। আল আরাবিয়া চ্যানেলে প্রচারিত একটি সিসিটিভি ফুটেজে (যার সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি) দেখা যায়, বন্দুকধারীরা শেলি কিটেলসনকে তার গাড়ি থেকে জোরপূর্বক টেনে বের করে নিজেদের গাড়িতে তুলে দ্রুত চম্পট দেয়।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরপরই ইরাকি স্পেশাল ফোর্সের (Special Forces) একটি দল অপহরণকারীদের পিছু ধাওয়া করে। ধাওয়ার এক পর্যায়ে অপহরণকারীদের একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। সেখান থেকে নিরাপত্তা বাহিনী একজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও, অন্য একটি গাড়ি সাংবাদিক কিটেলসনকে নিয়ে বাগদাদের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বর্তমানে নিখোঁজ সাংবাদিককে উদ্ধারে ব্যাপক ‘Field Intelligence Operation’ শুরু হয়েছে।
উপেক্ষিত ছিল মার্কিন প্রশাসনের সতর্কতা
‘আল-মনিটর’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সূত্রগুলো আগে থেকেই শেলি কিটেলসনের ওপর সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে অবগত ছিল। তাকে ইরাকের মতো ‘High-risk Zone’-এ ভ্রমণ না করার জন্য বারবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পেশাগত তাগিদে ওই মার্কিন সাংবাদিক ইরাকেই অবস্থান করছিলেন। এর আগে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস নাগরিকদের দ্রুত ইরাক ছাড়ার নির্দেশ জারি করেছিল এবং অপহরণের উচ্চ ঝুঁকির বিষয়ে ‘Travel Advisory’ প্রকাশ করেছিল।
আঞ্চলিক সংঘাত ও মিলিশিয়া যোগসূত্র
এই অপহরণের নেপথ্যে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দায় স্বীকার না করলেও, আঙুল উঠছে ইরান-সমর্থিত স্থানীয় মিলিশিয়াদের (Militia) দিকে। বিশেষ করে গাজা ও লেবানন পরিস্থিতির পর ইরান-ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় ইরাকের অভ্যন্তরে মার্কিন স্থাপনা ও নাগরিকদের ওপর হামলা ও অপহরণের ঘটনা কয়েকগুণ বেড়েছে। গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করে দরকষাকষির কৌশল হিসেবে এই অপহরণ সংঘটিত হতে পারে।
স্মৃতিতে এলিজাবেথ সুরকভ মামলা
শেলি কিটেলসনের এই ঘটনা ২০২৩ সালে বাগদাদ থেকে নিখোঁজ হওয়া প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলিজাবেথ সুরকভের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সুরকভকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী ‘কাতাইব হিজবুল্লাহ’ দীর্ঘ সময় আটকে রেখেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুক্তি পান। সুরকভের মতো কিটেলসনও ইরাকি মিলিশিয়াদের কবলে পড়েছেন কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন।
বর্তমানে ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং ড্রোনের মাধ্যমে বাগদাদের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই ঘটনার পর ইরাকে অবস্থানরত অবশিষ্ট বিদেশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।