সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতার অঞ্চলটির অন্তত ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক বিশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় আরব দেশগুলো সম্মিলিতভাবে ১২০ বিলিয়ন থেকে ১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত জিডিপি হারাতে পারে। এই বিশাল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি মূলত জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়াকে এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক আবদুল্লাহ আল-দারদারি এই পরিস্থিতিকে 'তীব্র অর্থনৈতিক ধাক্কা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যম আশারক আল-আওসাতকে জানান, সাধারণত একটি অঞ্চলে দারিদ্র্যের এমন বৃদ্ধি হতে কয়েক বছর সময় লাগে, যা এখানে মাত্র এক মাসেই ঘটে গেছে। তিনি মনে করেন, এই সংকট এ অঞ্চলের দেশগুলোকে তাদের কৌশলগত আর্থিক এবং সামাজিক নীতিগুলো মৌলিকভাবে পুনর্বিবেচনা করার জন্য একটি সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ২৫ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানির জন্য চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় খরচ বেড়ে গেছে, ফলে আঞ্চলিক অর্থনীতির চাকাও স্থবির হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি বাণিজ্যের এই চরম স্থবিরতার ফলে আরব অঞ্চলে বেকারত্বের হার প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে, যা গত ২০২৫ সালে পুরো অঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া মোট কর্মসংস্থানের চেয়েও বেশি। বিশেষ করে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলো এবং লেভান্ট অঞ্চলের দেশগুলো তাদের জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি হারাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক দাবানল সবচেয়ে বেশি আঘাত হানবে লেভান্ট অঞ্চলে, যার মধ্যে রয়েছে ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান এবং লেবানন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই অঞ্চলে নতুন করে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হবে। দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ কাটিয়ে ওঠা সিরিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি হবে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। পুরো আরব বিশ্বে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ৭৫ শতাংশই ঘটবে এই লেভান্ট অঞ্চলে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু দেশ বিকল্প পথের সন্ধান শুরু করেছে। সৌদি আরব বর্তমানে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে প্রবাহিত তেলের পাইপলাইনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইরাক এবং সিরিয়ার মধ্যে স্থলপথে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের বিষয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা চলছে। তবে সমুদ্রপথের বিশাল বাণিজ্যের তুলনায় এই বিকল্পগুলো কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
৩১ মার্চ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি মূলত একটি চরম নেতিবাচক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে তেলের বাজার পুরোপুরি বিধ্বস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের স্থায়িত্ব বাড়লে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বহুগুণ বাড়তে পারে। বর্তমানে কুয়েতি তেলবাহী জাহাজে হামলার মতো ঘটনাগুলো এই অঞ্চলের নৌ-নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট