পাহাড়ের উর্বর মাটি আর কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করে কৃষিতে নতুন এক ‘Success Story’ তৈরি করেছেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভার চেয়ারম্যান পাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন। মাত্র ৬ শতক জমিতে উন্নত জাতের হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ করে তিনি এখন স্থানীয় পর্যায়ে এক সফল কৃষকের প্রতিচ্ছবি। নিজের অদম্য ইচ্ছা আর পরিবারের সম্মিলিত পরিশ্রমে ইতোমধ্যেই প্রায় ৮০ হাজার টাকার ঢেঁড়স বিক্রি করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন এই তরুণ।
পুঁজি ও পারিবারিক শ্রমের সমন্বয়
জানা গেছে, ইব্রাহিম হোসেন মাটিরাঙ্গার মাস্টারপাড়া এলাকায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি জমি বন্ধক নেন। এরপর বাজার থেকে সংগ্রহ করেন উচ্চ ফলনশীল ‘Hybrid’ ঢেঁড়সের বীজ। তবে ইব্রাহিমের সাফল্যের নেপথ্যে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তার পরিবার। ইব্রাহিম নিজে, তার বাবা আব্দুল করিম এবং ছোট ভাই মিলে বাগানটির সার্বিক পরিচর্যা করছেন। বাইরে থেকে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ না করায় তাদের ‘Production Cost’ বা উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমেছে, যা লাভের অংককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফলন ও বাজারমূল্য
বর্তমানে ইব্রাহিমের বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ কেজি ঢেঁড়স তোলা হচ্ছে। বাজারে এখন প্রতি কেজি ঢেঁড়স ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও বাজারের অস্থিরতায় সবজির দাম মাঝে মাঝে ওঠানামা করে, তবুও গুণগত মান ভালো হওয়ায় ভালো দাম পাচ্ছেন ইব্রাহিম।
ইব্রাহিম হোসেন বলেন, “গাছগুলো এখনো মাঝারি আকৃতির। পূর্ণবয়স্ক হলে ‘Yield’ বা ফলন আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আমি আশাবাদী। কড়া রোদে গাছের হুল শরীরে লাগলে চুলকানি হয়, এই ভয়ে অনেকে শ্রমিক পান না। কিন্তু ধৈর্য ধরে সঠিক সুরক্ষায় কাজ করলে এটি বড় কোনো বাধা নয়।”
পারিবারিক সচ্ছলতা ও অনুপ্রেরণা
এই ঢেঁড়স বাগান থেকেই বর্তমানে ইব্রাহিমের পুরো পরিবারের ভরণপোষণসহ যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে। ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল করিম বলেন, “নিজেরা মিলে কাজ করায় ফলন ও লাভের বিষয়ে আমরা সরাসরি তদারকি করতে পারছি। নিয়মিত পরিচর্যা না করলে সবজির মান নষ্ট হয়ে যায়, তাই আমরা সবাই মিলে সময় দেই।”
ইব্রাহিমের ছোট ভাই বাগানের পরিচর্যার পাশাপাশি বাজারে বিক্রির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তাদের এই পারিবারিক উদ্যোগটি এখন স্থানীয় বেকার যুবকদের জন্য ‘Agribusiness’ বা কৃষি ব্যবসায় আগ্রহী হওয়ার একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাটিরাঙ্গায় ঢেঁড়স চাষের পরিসংখ্যান
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এই অঞ্চলে ঢেঁড়স চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলায় ৩১ হেক্টর জমিতে ঢেঁড়স চাষ করা হয়েছিল। পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩২ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ‘নিরিবিলি’ জাত ২১ হেক্টর এবং ‘সুপ্রিয়া’ জাত ১২ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “মাটিরাঙ্গার ‘Agro-Climatic Condition’ সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ইব্রাহিমের মতো তরুণরা হাইব্রিড জাতের ফসল চাষে এগিয়ে আসায় স্থানীয় কৃষি খাত সমৃদ্ধ হচ্ছে। সঠিক সময়ে ফসল সংগ্রহ এবং নিয়মিত পরিচর্যা করলে ঢেঁড়স একটি অত্যন্ত ‘Profitable Crop’ বা লাভজনক ফসল হতে পারে। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।”
ইব্রাহিমের বাগান থেকে আগামী ভাদ্র মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে ক্ষুদ্র পরিসরেও যে ভাগ্যের পরিবর্তন করা সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন খাগড়াছড়ির এই সফল কৃষি উদ্যোক্তা।