বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে ঋতুচক্রের আচরণ এখন অনেকটাই অননুমেয়। কাঠফাটা রোদের মাস হিসেবে পরিচিত চৈত্রের মাঝামাঝিতে এসেও শীতের আবহ দেখল উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ভোরে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যায় জেলার দিগন্তবিস্তৃত পথঘাট ও ফসলি মাঠ। বসন্তের শেষবেলায় প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে একদিকে যেমন জনজীবনে বিস্ময় জেগেছে, অন্যদিকে বেড়েছে মৌসুমি রোগের প্রকোপ ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দুশ্চিন্তা।
কুয়াশার দাপট ও তাপমাত্রার পরিসংখ্যান স্থানীয় সূত্র ও আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, বুধবার গভীর রাত থেকেই পঞ্চগড়ে কুয়াশা পড়তে শুরু করে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত জেলার অধিকাংশ এলাকা ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল। তবে কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ হয়নি; বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের প্রখর তেজ কুয়াশাকে সরিয়ে প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের চিরচেনা রূপ ফিরিয়ে আনে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (Degree Celsius)। বর্তমানে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৮ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করলেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রির ঘরে থাকায় রাতে ও ভোরে হালকা শীত অনুভূত হচ্ছে।
কেন এই অস্বাভাবিক কুয়াশা? চৈত্রের এই সময়ে ঘন কুয়াশা পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন আবহাওয়া কর্মকর্তারা। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা (Humidity) বৃদ্ধি এবং হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে জলীয়বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এছাড়া মৌসুমি বায়ুর আগাম সক্রিয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) ফলে আবহাওয়ার ধরনে এমন আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন মাঝেমধ্যেই এমন কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর দেখা যেতে পারে, যদিও দিনের বেলায় গরমের তীব্রতা কমার সম্ভাবনা নেই।
কৃষি ও জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব গত তিন সপ্তাহ ধরে পঞ্চগড়ের প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দিনে প্রখর রোদ থাকলেও রাতে ভারী বৃষ্টিপাত কিংবা ভোরে ঘন কুয়াশা পড়ছে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। সাধারণত এই সময়ে গম, ভুট্টা ও মরিচসহ বিভিন্ন রবি শস্য (Rabi Crops) পরিপক্ক হওয়ার কথা। কিন্তু অসময়ের বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে ফসলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মরিচ ও গমের ফলন নিয়ে শঙ্কিত জেলার চাষিরা।
অন্যদিকে, তাপমাত্রার এই দ্রুত ওঠানামা বা ‘ওয়েদার ফ্ল্যাকচুয়েশন’-এর কারণে পঞ্চগড় জুড়ে ঘরে ঘরে বাড়ছে জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো স্বাস্থ্য সমস্যা। শিশু ও বৃদ্ধরা এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যার ফলে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে বহির্বিভাগে রোগীর চাপ বেড়েছে।
উপসংহার চৈত্রের কাঠফাটা রোদের পরিবর্তে ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাস প্রকৃতির এক নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদরা। প্রকৃতির এই ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলায় কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।