মাঠের পারফরম্যান্সে গত বছরটি চেলসির জন্য ছিল এক কথায় দুর্দান্ত। উয়েফা কনফারেন্স লিগ জয় থেকে শুরু করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চতুর্থ স্থান দখল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নিশ্চিত করা—সবখানেই ছিল ব্লুজদের দাপট। এমনকি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপাও নিজেদের শোকেসে তুলেছে স্টামফোর্ড ব্রিজের ক্লাবটি। কিন্তু মাঠের সেই সাফল্যগাথা ম্লান হয়ে গেছে ক্লাবের হিসাবরক্ষণ খাতার ভয়াবহ চিত্রে। আয়ের নতুন রেকর্ড গড়েও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে এই লন্ডনি জায়ান্ট।
রেকর্ড আয়ের আড়ালে বিশাল ক্ষত সদ্য সমাপ্ত আর্থিক বছরে চেলসি ৫৬০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি) আয় করেছে। ডিজিটাল কন্টেন্ট, টিকিট বিক্রি এবং স্পনসরশিপ থেকে আসা এই বিশাল অংকের রাজস্ব সত্ত্বেও বছর শেষে তাদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি (প্রায় ৪২৮০ কোটি টাকা)।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’ জানিয়েছে, এই অঙ্কটি প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে একক কোনো ক্লাবের সর্বোচ্চ লোকসানের রেকর্ড। এর আগে ২০১১ সালে ম্যানচেস্টার সিটি ২০৫ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ২৯০০ কোটি টাকা ঘাটতির মুখে পড়েছিল। চেলসির বর্তমান লোকসান সেই রেকর্ডকেও বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে।
পুরনো পাপ ও জরিমানার বোঝা বিশাল এই আর্থিক ধসের পেছনে কাজ করেছে একাধিক কারণ। ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রান্সফার মার্কেটে (Transfer Market) আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের দায়ে উয়েফা চেলসিকে ৩১ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করেছিল, যার বড় প্রভাব পড়েছে এই ব্যালেন্স শিটে। এছাড়া ক্লাবের সাবেক মালিক রোমান আব্রামোভিচের আমলে খেলোয়াড়দের এজেন্টদের দেওয়া অর্থের অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষের বড় অংকের জরিমানাও এই লোকসানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পাশাপাশি রাহিম স্টার্লিংয়ের মতো তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে চুক্তি নিষ্পত্তি (Contract Settlement) এবং দলের বিভিন্ন খেলোয়াড়দের সাইনিং বোনাস ও বিবিধ খরচ ক্লাবের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। মূলত গত কয়েক বছরের আগ্রাসী বিনিয়োগ ও আইনি জটিলতাই ক্লাবটিকে এই সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আর্থিক ফেয়ার প্লে ও প্রিমিয়ার লিগের কড়াকড়ি প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান আর্থিক নীতিমালা বা প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রুলস (PSR) অনুযায়ী, একটি ক্লাব টানা তিন বছরে সর্বোচ্চ ১২০ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত লোকসান করতে পারে। চেলসি এই সীমার অনেকটাই ওপরে অবস্থান করছে। তবে ক্লাব ম্যানেজমেন্ট আশাবাদী যে তারা এই প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। স্টামফোর্ড ব্রিজের নীতিনির্ধারকদের দাবি, তারা আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং লিগের নিয়মনীতি মেনে চলতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বিশাল লোকসানের এই রেকর্ড সত্ত্বেও চেলসি আগামী বছর নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। এর পেছনে কাজ করছে কিছু কৌশলগত বাণিজ্যিক সমীকরণ। গত গ্রীষ্মে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জেতায় ক্লাবটি প্রায় ১০০ মিলিয়ন ইউরো বোনাস পাবে। এছাড়া চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুবাদে টেলিভিশন স্বত্ব (TV Rights) থেকে আরও ৯০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্লাবের ‘মার্কেট ভ্যালু’ (Market Value) এবং আর্থিক ভারসাম্য পুনরায় ফিরিয়ে আনবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, মাঠের সাফল্যের সঙ্গে ব্যাংকের হিসাব মেলাতে চেলসিকে আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে চলতে হবে। বড় বিনিয়োগের এই মডেলে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন স্টামফোর্ড ব্রিজের প্রধান চ্যালেঞ্জ।