তেহরান এই হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। এই ঘটনাকে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে মার্কিন সামরিক অভিযানের কৌশলে এক নতুন মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
কারাজ শহরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বি-১ সেতু এবং তেহরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউটে এই হামলা এমন সময় চালানো হলো, যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ইরানি নেতারা আলোচনায় না বসলে দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
হামলার দায় কোনও পক্ষ সরাসরি স্বীকার না করলেও বৃহস্পতিবার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প সেতুর ধ্বংসযজ্ঞের প্রশংসা করে লিখেছিলেন, ‘ইরানের সবচেয়ে বড় সেতুটি ধসে পড়েছে, যা আর কখনও ব্যবহৃত হবে না। সামনে আরও আসছে!’ তিনি ইরানি নেতাদের দ্রুত চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘খুব দেরি হওয়ার আগেই চুক্তি করুন, অন্যথায় এক সময়ের মহান এই দেশটির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
দুজন মার্কিন কর্মকর্তা আল-মনিটরকে নিশ্চিত করেছেন যে কারাজ শহরের কাছের সেতুটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীই হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, এই সেতুটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বাহিনীর রসদ সরবরাহের পরিকল্পিত রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সেখানে বা তার আশপাশে আমাদের কোনও লক্ষ্যবস্তু ছিল না, ইসরায়েলের ছিল।’
ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানকে আলোচনার জন্য ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে তিনি বলেন, ‘আমরা সেতুতে আঘাত করবো। আমরা কিছুতে করেছিও। আমাদের মাথায় আরও দারুণ কিছু সেতুর পরিকল্পনা আছে। আমরা তাদের যা ক্ষতি করেছি, তা পুনর্গঠন করতে ওদের ১৫-২০ বছর সময় লাগবে।’
পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ইরান রাজি না হলে মার্কিন যুদ্ধ বিভাগ (পেন্টাগন) আরও তীব্রতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে যাবে।’
বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প তার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘চুক্তি না হলে আমরা তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে এবং সম্ভবত একই সঙ্গে আঘাত হানবো।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমরা এখনও তাদের তেলের ওপর আঘাত করিনি, যদিও সেটি সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু। কারণ তাতে তাদের বেঁচে থাকা বা পুনর্গঠনের ন্যূনতম সুযোগও থাকবে না।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানে ১২ হাজার ৫০০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এতে ইরানের প্রথাগত নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ইরান এখনও ড্রোন এবং দ্রুতগামী নৌযানের মতো অপ্রতিসম সক্ষমতা টিকিয়ে রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
রেড ক্রসের তথ্যমতে, গত এক মাসে এই অভিযানে ইরানে ১ হাজার ৯০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশটিতে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তেহরানের ১০৫ বছরের পুরোনো পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলাকে কেবল যুদ্ধাপরাধ নয়, বরং ‘মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের ওপর বর্বর আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
অন্যদিকে, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে গবেষণাকেন্দ্রগুলোতে হামলা শুরু করেছে। কারণ তেহরান তাদের লড়াকু সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং ওই সাইটগুলো তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির অংশ। তবে বেসামরিক পানি শোধনকেন্দ্রে হামলার হুমকি নিয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।